বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সার্বভৌমত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার দেশভিত্তিক বৈদেশিক নীতি না করার কথা বললেও বাস্তবে বাণিজ্য চুক্তির কারণে কোন দেশ থেকে তেল কেনা হবে, সে বিষয়েও অনুমতির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
রাজধানীতে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির আয়োজনে ‘বাজেটে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক প্রাক্-বাজেট ছায়া সংসদ বিতর্কে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রশ্ন তোলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) কেন ঋণের কিস্তি ছাড় করছে না এবং অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে নেওয়া সংস্কার প্রস্তাবগুলো কেন বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি বলেন, অর্থনীতি নিয়ে শ্বেতপত্র ও বিভিন্ন খাতভিত্তিক সংস্কার প্রস্তাব তৈরি হলেও সেগুলো এখন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
বর্তমান সরকারের সংস্কার কার্যক্রম নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, সরকারের প্রাথমিক পদক্ষেপ আশাব্যঞ্জক নয়। নির্বাচনী ইশতেহারে সংস্কার কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি থাকলেও দুই মাস পেরিয়ে গেলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। দ্রুত এ কমিশন গঠন করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় গঠিত ক্যাবিনেট সাব-কমিটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর ভাষায়, যদি পেট্রোলপাম্পে যানবাহনের দীর্ঘ সারি কমানোই না যায়, তাহলে ওই কমিটির কার্যক্রম কতটা ফলপ্রসূ তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
অর্থনীতিতে জ্বালানি ও ব্যাংক খাতকে ‘দুটি ফুসফুস’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ দুটির ওপরই অর্থনীতির গতি নির্ভর করে, আর সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা (পিএফএম) হচ্ছে এর ‘হৃদয়’। রাজস্ব আয়, ব্যয় ও ঘাটতি অর্থায়নের বিষয়গুলো এর অন্তর্ভুক্ত।
তিনি আরও বলেন, অর্থনীতিতে জ্বালানির গুরুত্ব অপরিসীম এবং জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। এ খাতে প্রণোদনা কাঠামো কী হবে, তা নির্ধারণে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দরকার।
গত ১৭ বছরে জ্বালানি খাতকে বিতর্কিত ও বিভ্রান্তিকর বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে গ্যাসের মজুদ থাকা সত্ত্বেও যথাযথ বিনিয়োগ হয়নি। বাপেক্সকে কার্যত অকার্যকর করে রাখা হয়েছে—বিদেশি বিনিয়োগ আনা যায়নি, আবার নিজেদের পক্ষ থেকেও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
জ্বালানি খাত সংস্কারে তিনি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশও তুলে ধরেন।
সেগুলো হলো—গরিবের করের টাকায় ধনীদের ভর্তুকি না দেওয়া; জ্বালানি অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানো; সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি আমদানি নিশ্চিত করা।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমান সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতির ভার নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে।’
প্রতিযোগিতায় ‘আগামী বাজেটে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের মাধ্যমেই অর্থনৈতিক সুরক্ষা অর্জন করা সম্ভব’ এ প্রস্তাবের ওপর আয়োজিত বিতর্কে ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দল বিজয়ী হয়। তারা ঢাকার স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় দলকে পরাজিত করে। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের মধ্যে ট্রফি, ক্রেস্ট ও সনদপত্র বিতরণ করা হয়।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর