• ঢাকা
  • ঢাকা, বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে
শাহীন মাহমুদ রাসেল
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২৩ মে, ২০২৬, ০১:৫২ দুপুর

প্রতিটি বাঁকে দু’টি করে মৃত্যু—এবার টনক নড়ল সরকারের

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

রাত তখন তিনটা। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের জাঙ্গালিয়া বাঁক। ঘন অন্ধকারে লবণবাহী ভারী ট্রাকের সারি এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলছে। হেডলাইটের আলোয় রাস্তার পিচ চকচক করছে- লবণপানির পিচ্ছিল আস্তরণে। বিপরীত দিক থেকে ছুটে আসছে একটি দ্রুতগামী বাস। দুটো যানবাহনের মাঝে দূরত্ব মাত্র কয়েক মিটার, সড়কের প্রস্থ মাত্র ২২ ফুট। সামান্য অসাবধানতা, একটু বেশি গতি- আর সেটাই পরিণত হয় শোকসংবাদে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের গল্প এভাবেই লেখা হয়েছে বছরের পর বছর ধরে। প্রতিটি বাঁকে জমে আছে কারও না কারও মৃত্যুর স্মৃতি।

বিআরটিএর তথ্য বলছে, শুধু ২০২৫ সালেই এই ১৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন ১৬০ জনের বেশি মানুষ, আহত হয়েছেন প্রায় চারশো জন। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে একই পুরোনো সমীকরণ- সরু সড়ক, বিপজ্জনক বাঁক, বেপরোয়া গতি আর লাগামহীন যানচাপ।

দুই দশক ধরে এই সড়কে মানুষ মরেছে। স্বজনেরা কেঁদেছেন। প্রতিশ্রুতি এসেছে, গেছে। সড়ক বদলায়নি। এবার অবশেষে টনক নড়েছে সরকারের। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক সরলীকরণ, সড়ক প্রশস্তকরণ ও চার লেনে উন্নীত করার কাজ শুরু হয়েছে মাঠে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে মোট ৭৭টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক চিহ্নিত করেছে সড়ক বিভাগ। সংখ্যাটি শুনতে যতটা নিরীহ, বাস্তবে ততটাই ভয়াবহ। এর মধ্যে চুনতি, জাঙ্গালিয়া, কক্সবাজার প্রবেশ গেইট, ইনানী, বরইতলী, ডুলাহাজারা ও ফাঁসিয়াখালী এলাকার বাঁকগুলো সবচেয়ে প্রাণঘাতী বলে জানিয়েছেন যাঁরা প্রতিদিন এই পথে গাড়ি চালান।

শ্যামলী পরিবহনের চালক আলী আকবর বললেন, 'এসব স্থানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। বাঁকগুলো এত তীক্ষ্ণ যে বড় গাড়ি নিয়ে ঢুকলে পুরো লেন দখল হয়ে যায়। বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ি সামলানোর সুযোগ থাকে না।'

সড়ক বিভাগ কক্সবাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী রোকনউদ্দিন খালেদ চৌধুরী জানালেন, যেসব বাঁকে দুর্ঘটনার হার সবচেয়ে বেশি, সেগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরলীকরণের কাজ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি বাঁক চিহ্নিত করে সড়কটিকে যতটা সম্ভব সোজা ও নিরাপদ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

চুনতির জাঙ্গালিয়া এলাকা। মহাসড়কের সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশগুলোর একটি। এখানেই এখন চলছে পরিবর্তনের কাজ।

সরজমিনে দেখা গেল, সড়কের দুই পাশে চলছে গাছ কাটার কাজ। শ্রমিকেরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। রোলার দিয়ে মাটি শক্ত করা হচ্ছে, পাশাপাশি সড়ক প্রশস্ত করতে ফেলা হচ্ছে মাটি ও ইট। চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের আওতায় জোরগতিতে এগিয়ে চলছে ৯০০ মিটার সড়ককে চার লেনে উন্নীত করার কাজ। কক্সবাজার সড়ক বিভাগের আওতায় একই এলাকায় চলছে আরও ৭০০ মিটারের কাজ। অর্থাৎ শুধু জাঙ্গালিয়াতেই মোট প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিটার সড়ক রূপান্তরিত হচ্ছে চার লেনে।

রোলার অপারেটর মোহাম্মদ রিয়াজ বললেন, 'প্রায় এক মাস ধরে কাজ করছি। নির্ধারিত অংশের একটি লেনের কাজ শেষ পর্যায়ে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তা সম্পন্ন হবে।'

মহাসড়কের কক্সবাজার অংশ বর্তমানে মাত্র ৬ দশমিক ৭ মিটার বা ২২ ফুট প্রশস্ত। একটি আধুনিক দ্রুতগামী বাসের প্রস্থ ধরলে বোঝা যায়, বিপরীত দিক থেকে আরেকটি বাস এলে দুটোর মাঝে থাকে সামান্যতম ব্যবধান। ভুল মুহূর্তে একটু বেশি গতি মানেই সর্বনাশ। এই সংকট কাটাতে ৬৬ কিলোমিটার সড়ক ৩৪ ফুটে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ১১ দশমিক ৭২ কিলোমিটারের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। চকরিয়া কলেজ, বরইতলী ও ইনানী এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ৬টি বাঁকও সরলীকরণ করা হচ্ছে।

নির্বাহী প্রকৌশলী রোকনউদ্দিন খালেদ চৌধুরী জানালেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় জাঙ্গালিয়া থেকে এসএমঘাট সেতু পর্যন্ত পুরো সড়ককে ১০ দশমিক ৩ মিটারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। পাশাপাশি সার্ভিস লেনসহ পুরো মহাসড়ককে ৬ লেনে উন্নীত করার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও চলমান।

এই সড়কে যারা প্রতিদিন গাড়ি চালান, তাদের কণ্ঠে ক্লান্তি আর আতঙ্ক মিলেমিশে একাকার।

হানিফ পরিবহনের চালক রুহুল আমিন বললেন, 'ইজিবাইক, মিশুক, সিএনজি অটোরিকশা আর মোটরসাইকেলের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল সবচেয়ে বেশি বিপদ তৈরি করে। এর ওপর লবণবাহী ট্রাকের পানিতে সড়ক পিচ্ছিল হয়ে থাকে। আতঙ্ক নিয়েই প্রতিদিন স্টিয়ারিং ধরতে হয়।'

চকরিয়ার বাসিন্দা সাংবাদিক মুহসিন জানালেন, 'রাত তিনটা থেকে সকাল ১০-১১টার মধ্যে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এ সময় লবণবাহী ট্রাক আর মাছবাহী যানবাহনের চাপে সড়কে এমন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় যে যেকোনো মুহূর্তে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।'

যাত্রী ইয়াকুব আলীর কথায় উঠে এল দীর্ঘ পুঞ্জীভূত হতাশা। তিনি বললেন, 'প্রায় ২০ বছর আগে সড়কটি যেমন ছিল, এখনো অনেকাংশে তেমনই রয়ে গেছে। আগে ছোট বাস চলত, এখন বড় আধুনিক বাস চলছে। কিন্তু সড়কের উন্নয়ন হয়নি। যখন এই পথে যাত্রা করি, মনে হয় জীবন ঝুঁকি নিয়েই পথে বেরিয়েছি।'

কুমিল্লা থেকে আসা পর্যটক ইমতিয়াজ উদ্দিন মিজান বললেন, 'ট্রেনের টিকিট না পেলে বাধ্য হয়ে এই পথ বেছে নিতে হয়। কিন্তু যাত্রা শুরু হলে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন থাকেন। নিরাপদে পৌঁছাতে পারব কি না, সেই দুশ্চিন্তা তাদের পিছু ছাড়ে না।'

বাঁক সোজা হলেই কি থামবে মৃত্যু? শুধু বাঁক সরলীকরণেই কি সমাধান মিলবে? এই প্রশ্নে চালক ও বিশেষজ্ঞ- কেউই আশাবাদী নন।

চালক ইদ্রিস আলী বললেন, 'যানবাহনের চাপ যেভাবে বাড়ছে, তাতে ৬ লেন না করলে দুর্ঘটনা পুরোপুরি কমবে না। শুধু বাঁক ঠিক করলে হবে না।'

বিআরটিএর কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. কামরুজ্জামানও একমত। তিনি বললেন, 'পর্যটননির্ভর এই জেলায় প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক যানবাহন প্রবেশ করছে। সড়ক ৬ বা ৮ লেনে উন্নীত করা গেলে যানজট ও দুর্ঘটনা- দুটোই অনেকাংশে কমে আসবে।'

জাঙ্গালিয়ার বাঁকে এখন রোলারের শব্দ। মাটি কাটা হচ্ছে, ইট পড়ছে, সড়ক চওড়া হচ্ছে। দেরিতে হলেও কাজ শুরু হয়েছে- এটুকু স্বস্তির। কিন্তু ১৬০টি মৃত্যু পেরিয়ে আসা এই উদ্যোগ কতটা যথেষ্ট, সেই প্রশ্নের জবাব এখনো মেলেনি। যতদিন না মেলে, ততদিন এই পথের প্রতিটি বাঁকে লেগে থাকবে পুরোনো আতঙ্কের ছায়া। এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সালাউদ্দিন/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:


BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ [email protected]
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ [email protected]