• ঢাকা
  • ঢাকা, রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ২০ মিনিট পূর্বে
শাহীন মাহমুদ রাসেল
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ০১ জুন, ২০২৬, ১১:৫৭ দুপুর

ঈদকে পুঁজি করে বালিয়াড়ি দখল, গড়ে উঠল শত শত দোকান

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

মাত্র আড়াই মাস আগে যৌথ বাহিনীর অভিযানে দখলমুক্ত হয়েছিল কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা, কলাতলী ও লাবণী পয়েন্টের বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ি। দীর্ঘদিনের অবৈধ দখল উচ্ছেদে তখন স্বস্তি ফিরেছিল সৈকতে। উন্মুক্ত হয়েছিল সমুদ্রের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে রাতের আঁধারে আবারও দখল হয়ে গেছে সৈকতের বালিয়াড়ি। সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পর্যন্ত সৈকতের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে চার শতাধিক ঝুপড়ি দোকান, অস্থায়ী রেস্তোরাঁ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। মাত্র কয়েক মাস আগে উচ্ছেদ হওয়া একই স্থানে ফের ফিরে এসেছে পুরোনো দখলদারিত্ব।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা এবং উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট আদেশ থাকার পরও কারা এত বড় সাহস নিয়ে আবার বালিয়াড়ি দখল করল? এমন প্রশ্ন পর্যটন সংশ্লিষ্টদের।

পরিবেশবাদী, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকরা বলছেন, প্রশাসনের নীরবতা ও নজরদারির অভাবের সুযোগেই একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট আবারও সৈকতের বালিয়াড়ি দখলে নিয়েছে।

জেলা প্রশাসনের নিয়োগপ্রাপ্ত এক বিচকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঈদের আগের কয়েক রাত থেকেই শুরু হয় বালিয়াড়ি দখলের প্রস্তুতি। গভীর রাতে ট্রাক ও ভ্যানগাড়িতে করে নির্মাণসামগ্রী এনে দ্রুতগতিতে দোকান বসানো হয়। প্রশাসনিক তৎপরতা কম থাকায় কয়েক দিনের মধ্যেই সুগন্ধা, কলাতলী ও সিগাল পয়েন্টজুড়ে গড়ে ওঠে শত শত দোকান।

সরেজমিনে দেখা যায়, শুধু সুগন্ধা জামে মসজিদের পাশের বালিয়াড়িতেই রয়েছে শতাধিক দোকান। কলাতলী ও সিগাল পয়েন্টের ঝাউবাগান এলাকাতেও নতুন করে দোকান বসানোর প্রস্তুতি চলছে। অনেক স্থানে ঝাউগাছের চারপাশ ঘিরে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। শনিবার গভীর রাতেও কলাতলী সৈকত ও সিগাল হোটেলের সামনের এলাকায় নতুন দোকান বসানোর কাজ চলতে দেখা গেছে।

রোববার দুপুরে সুগন্ধা পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, গত ১২ মার্চ যৌথ বাহিনীর অভিযানে উচ্ছেদ করা এলাকাগুলোতেই আবারও গজিয়ে উঠেছে অবৈধ দোকানপাট। সাইনবোর্ডহীন দোকান, গোপন মালিক দখলকৃত এলাকায় স্থাপিত অধিকাংশ দোকানেই নেই কোনো সাইনবোর্ড। দোকানগুলোর মালিক কারা, সেটিও প্রকাশ করা হচ্ছে না। কর্মচারীরা মালিকদের নাম বলতে অস্বীকৃতি জানান।

দোকানগুলোতে বিক্রি হচ্ছে শামুক-ঝিনুকের তৈরি হস্তশিল্প, কাপড়, খেলনা, রোদচশমা, আচার, প্রসাধনসামগ্রী, চা-কফি, ভাজা মাছসহ নানা ধরনের খাদ্যপণ্য। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, অধিকাংশ দোকানই তৈরি করা হয়েছে ভ্যানগাড়ির ওপর। নিচে লাগানো হয়েছে চাকা। উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার সুবিধার্থেই এমন কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে বলে জানান দোকানকর্মীরা।

একটি দোকানের কর্মচারী রফিকুল ইসলাম বলেন, 'উচ্ছেদের বিরুদ্ধে মালিকেরা হাইকোর্টে রিট করেছেন। সেই সুযোগে আবার দোকান বসানো হয়েছে। এই দোকানটি উচ্ছেদের আগে প্রায় ১০ বছর ধরে এখানে ছিল।'

তিনি জানান, সকাল সাতটা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকে এবং প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিক্রিও হয়।

ঢাকার মিরপুর থেকে পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে কক্সবাজারে ঘুরতে আসা সেলিম গাজী, নিয়াজ মোর্শেদ, রাইয়ান ফুয়াদ ও তাইজুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, '*কক্সবাজারের সৌন্দর্যের গল্প শুনে এসেছিলাম, কিন্তু বাস্তবে এসে দেখলাম বালিয়াড়ি দখল করে ত্রিপলঘেরা দোকানের সারি। দূর থেকে দেখলে এটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র নয়, বরং একটি অস্থায়ী শরণার্থী শিবির বলে মনে হয়। সৈকতের সৌন্দর্য ও পরিবেশ যেভাবে নষ্ট করা হচ্ছে, তা সত্যিই লজ্জাজনক। প্রশাসনের চোখের সামনেই এমন দখলদারিত্ব চললেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।'* গত ৯ মার্চ জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সৈকতের সব অবৈধ স্থাপনা এক সপ্তাহের মধ্যে উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১২ মার্চ জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে পরিচালিত যৌথ বাহিনীর অভিযানে সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে ৯৩০টি দোকানসহ বিপুলসংখ্যক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। পরবর্তী কয়েক দফা অভিযানে লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্ট মিলিয়ে আরও শতাধিক স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়।

সৈকত পরিদর্শনে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, 'উচ্ছেদের পর কোনোভাবেই যেন বালিয়াড়িতে নতুন করে দোকান বসতে না পারে, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও ট্যুরিস্ট পুলিশকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।'

কিন্তু বাস্তবে সেই নির্দেশনা কার্যকর হয়নি। ঈদের ছুটিতে কয়েক রাতের ব্যবধানে পুরো এলাকাই আবারও দখল হয়ে যায়।

জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, উচ্ছেদ হওয়া ব্যক্তিদের একটি অংশ সম্প্রতি উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেছেন।

তিনি বলেন, 'আদালত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছেন। আমরা জবাব দাখিলের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।'

তবে স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, আদালতে রিট বিচারাধীন থাকলেও নতুন করে শত শত অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো?

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে নাজিরারটেক থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়।

আইন অনুযায়ী, জোয়ার-ভাটার সীমা থেকে ৩০০ মিটার পর্যন্ত এলাকায় স্থায়ী কিংবা অস্থায়ী কোনো স্থাপনা নির্মাণ, ভূমি ভরাট বা উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা নিষিদ্ধ। উচ্চ আদালতও একাধিক আদেশে সৈকতের বালিয়াড়ি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে সেই আইন ও নির্দেশনা বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে।

পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ‘সেভ দ্য কক্সবাজার’-এর সভাপতি তৌহিদ বেলাল বলেন, 'সরকার পরিবর্তনের সুযোগে একটি চক্র আবারও বালিয়াড়িতে দোকান বসানোর অনুমতি দেওয়ার নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করছে। প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় দখলদাররা উৎসাহিত হচ্ছে।'

তিনি আরও বলেন, 'সৈকতে প্রবেশমুখে এসব দোকান শুধু পরিবেশের ক্ষতিই করছে না, পর্যটকদের জন্যও বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।'

ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস)-এর চেয়ারম্যান মুজিবুল হক বলেন, 'স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা এবং উচ্চ আদালতের আদেশকে কার্যত বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শত শত স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এখন ঝাউবাগান পর্যন্ত দখল শুরু হয়েছে। এটি অব্যাহত থাকলে সৈকতের জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।'

কক্সবাজার হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, 'প্রতি বছর ৭০ থেকে ৮০ লাখ পর্যটক কক্সবাজারে আসেন। মার্চের উচ্ছেদের পর সৈকতে একটি উন্মুক্ত ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। পর্যটকেরা স্বস্তিতে হাঁটাচলা করতে পারছিলেন।'

তিনি আরও বলেন, 'এখন আবার পুরোনো অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে সৈকত। সন্ধ্যার পর অনেক পর্যটক সৈকতে যেতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন। এসব ঝুপড়ি দোকানকে কেন্দ্র করে মাদক, চাঁদাবাজি ও নানা অপরাধ সংঘটনের অভিযোগও রয়েছে।'

সংশ্লিষ্টদের মতে, মার্চের অভিযানে প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থানের কারণে অনেকেই মনে করেছিলেন, দীর্ঘদিনের অবৈধ দখল থেকে মুক্তি পেতে যাচ্ছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই আশায় ভাটা পড়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা, উচ্চ আদালতের আদেশ এবং পরিবেশ আইন থাকার পরও যদি শত শত দোকান রাতারাতি গড়ে উঠতে পারে, তাহলে এর পেছনে কারা রয়েছে, কারা প্রশ্রয় দিচ্ছে এবং কেন প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না, সেই প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে কক্সবাজারজুড়ে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিশ্বখ্যাত কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি কি আবারও দখলদারদের কবলে হারিয়ে যাবে, নাকি প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে সৈকতকে রক্ষা করবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সাজু/নিএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:


BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ info@bd24live.com
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ office.bd24live@gmail.com