সকাল সাড়ে নয়টা। বান্দরবানের পাহাড় থেকে সরাসরি কক্সবাজারের বালুচর। গাড়ি থামতে না থামতেই দিগন্তজোড়া নীল জলের ডাক। শরীয়তপুরের কাজিরহাট থেকে আসা জীবন মোল্লা আর দেরি করলেন না। ব্যাগ রাখার আগেই নেমে পড়লেন সি-গাল পয়েন্টের ঢেউয়ে। লাল পতাকার অর্থ তিনি জানতেন না। জানতেন না যে ঠিক এই পয়েন্টে গত বছর ঢেউয়ের টানে প্রাণ হারিয়েছেন ১২ জন মানুষ। এই অজানাটুকুই কখনো কখনো কেড়ে নেয় জীবন।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে প্রতিদিন এভাবেই হাজারো মানুষ নামছেন- আনন্দের নেশায়, সাগরের টানে, না জেনেই। কিন্তু আনন্দের সেই মুহূর্ত কখনো কখনো হয়ে যাচ্ছে অপূরণীয় শোক।
পরিসংখ্যান বলছে, গত ১২ বছরে এই সাগর গ্রাস করেছে ৭৪ জন পর্যটককে। শুধু গত বছরেই ডুবে মারা গেছেন ২৫ জন। আর জীবন নিয়ে ফিরেছেন ১ হাজার ২৫ জন- তাদের অনেকেই বুঝতেও পারেননি, কতটা কাছ থেকে মৃত্যু ছুঁয়ে গেছে।
জীবন মোল্লা বলেন, 'বান্দরবান ঘুরে সরাসরি সৈকতে নেমে পড়েছি। লাল পতাকা দেখেছি, কিন্তু অর্থ জানিনা। কেউ বলেনি, কেউ থামায়নি। নিরাপদ কোথায়, ঝুঁকিপূর্ণ কোথায়- এসব আমাদের কেউ জানায়নি। এসেছি সমুদ্র দেখতে, বিপদের কথা মাথায়ই ছিল না।'
সচেতন মহলের প্রশ্ন, বিশ্বের দীর্ঘতম এই সমুদ্রসৈকতে প্রতিবছর লাখো পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা প্রস্তুত? একের পর এক প্রাণহানির ঘটনার পরও কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে, তাদের ভূমিকা কি শুধু দুর্ঘটনার পর লাশের সংখ্যা গোনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
লাল পতাকা আছে, লাইফগার্ড নেই:
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সি-গাল পয়েন্টের বালুচরে বিপজ্জনক এলাকা চিহ্নিত করে লাল পতাকা টাঙানো আছে বটে। কিন্তু সেই পতাকার নিচে নেই কোনো সুস্পষ্ট সতর্কনির্দেশনা। নেই পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। নেই একজন লাইফগার্ডও। প্রায় এক কিলোমিটারজুড়ে এই নিরাপত্তাশূন্য প্রান্তরে প্রতিদিন অবাধে সমুদ্রে নামছেন পর্যটকরা- শিশু থেকে বৃদ্ধ, সবাই।
পর্যটক মো. লিংকন জানালেন, লাল পতাকার অর্থ যে বিপদ ও নিষেধাজ্ঞা- তা তিনি জানেন। তবু নেমেছেন, কারণ অন্য সবাই নামছেন। কেউ আটকাচ্ছে না, কেউ সতর্ক করছে না।
মিরপুর থেকে আসা পর্যটক জ্যোতি রহমানের অভিযোগ আরও স্পষ্ট। তিনি বলেন, 'হোটেলে চেক-ইনের সময় কোনো নিরাপত্তা নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। কক্ষেও নেই কোনো লিফলেট বা সতর্কবার্তা। কোন এলাকায় গোসল নিরাপদ, কোন সময়ে স্রোত বিপজ্জনক- এসব কিছুই তাকে জানানো হয়নি।' তার ভাষ্য, শুধু দুই পাশে পতাকা টাঙিয়ে দায়িত্ব শেষ করা উচিত নয়। পর্যটকদের সচেতন করতে আরও কার্যকর ব্যবস্থা দরকার।
সৈকতে ছাতার দায়িত্বে থাকা সুমন মুখার্জী বলেন, 'গত বছরও এই পয়েন্টে ১০ জনের বেশি পর্যটক সাগরে ভেসে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু একজন লাইফগার্ডও নেই এখানে।' তিনি আরও বলেন, 'লাইফগার্ড না থাকায় পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় পর্যটকরা নির্দেশনা না শুনে দূরে চলে যান, ডাকলেও সাড়া দেন না।'
এক কিলোমিটার সৈকতে চার লাইফগার্ড:
সুগন্ধা পয়েন্টের চিত্র সামান্য ভিন্ন, তবে নিরাপদ নয় মোটেও। এক কিলোমিটারজুড়ে লক্ষাধিক পর্যটকের ভিড়ে নিরাপত্তায় আছেন মাত্র চারজন লাইফগার্ড- একজন পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে, বাকি তিনজন বালুচরে টহল দিচ্ছেন। সরঞ্জাম বলতে রেসকিউ টিউব আর একটি উদ্ধার বোট।
সিনিয়র লাইফগার্ড জয়নাল আবেদীন ভূট্টো বলেন, 'আমরা সুগন্ধায় সাতজন লাইফগার্ড দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু প্রতিদিন পানিতে নামছেন ৫০ থেকে ৬০ হাজার পর্যটক। এই সীমিত জনবল দিয়ে এত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন।'
লাইফগার্ড কর্মী মো. সেলিম জানালেন, স্বাভাবিক দিনে পাঁচ থেকে দশটি উদ্ধার অভিযান চালাতে হয়। বর্ষায় সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ থেকে ১৫তে। কিন্তু হাতে আধুনিক কোনো যন্ত্রপাতি নেই।
সি-সেইফ লাইফগার্ড সংস্থার সুপারভাইজার মো. সাইফুল্লাহ সিফাত বলেন, 'আমরা এখনও অনেক ক্ষেত্রে সাঁতার কেটে বা প্যাডেল চালিয়ে উদ্ধার করছি। জেট স্কি বা আধুনিক রেসকিউ সরঞ্জাম থাকলে অনেক বেশি মানুষকে বাঁচানো সম্ভব হতো।'
তিনি আরও জানালেন, তিনটি সৈকতে কার্যকর নিরাপত্তা দিতে প্রয়োজন অন্তত ১০০ জনের বেশি লাইফগার্ড। বর্তমানে আছেন মাত্র ২৭ জন।
১২০ কিলোমিটারের মধ্যে সুরক্ষা মাত্র দেড় কিলোমিটারে:
সংখ্যাটা থমকে দেওয়ার মতো। কক্সবাজারের ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতের মধ্যে লাইফগার্ড সেবা আছে কেবল লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টের মোট দেড় কিলোমিটার এলাকায়। অর্থাৎ মাত্র সোয়া এক শতাংশ সৈকতে আছে নিরাপত্তার ছায়া। বাকি ১১৮.৫ কিলোমিটার পুরোপুরি লাইফগার্ড-শূন্য। সেখানে কেউ ডুবলে সাহায্যের জন্য ছুটে আসার কেউ নেই। এই বিশাল উপকূলে এক শিফটে দায়িত্বে আছেন মাত্র ১৮ জন লাইফগার্ড। আর পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে, বিদেশি অর্থায়নে। রাষ্ট্রের কোনো স্থায়ী লাইফগার্ড বাহিনী আজও গড়ে ওঠেনি।
রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক আরিফুল ইসলাম বলেন, 'প্রথমবার কক্সবাজারে এসেছি। সমুদ্রের কাছে গিয়ে বুঝতেই পারিনি কোন জায়গাটা নিরাপদ আর কোনটা ঝুঁকিপূর্ণ। শুধু কয়েকটি লাল পতাকা দেখেছি, কিন্তু এগুলোর অর্থ কী বা কোথায় নামা যাবে না, সে বিষয়ে কাউকে বলতে শুনিনি। পর্যটকদের জন্য আরও স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা দরকার।'
গাজীপুর থেকে আসা পর্যটক তানিয়া আক্তার বলেন, 'আমি পরিবার নিয়ে এসেছি। ছোট ছোট বাচ্চারাও সমুদ্রে নামছে। কিন্তু আশপাশে পর্যাপ্ত লাইফগার্ড চোখে পড়েনি। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত সাহায্য পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে আমাদের মধ্যে ভয় কাজ করছে।'
ঢাকার উত্তরা থেকে আসা পর্যটক সাইফুল আলম বলেন, 'বিদেশের অনেক সমুদ্রসৈকতে লাইফগার্ডদের খুব সক্রিয়ভাবে কাজ করতে দেখা যায়। কিন্তু এখানে বিশাল সৈকতের তুলনায় জনবল অনেক কম মনে হয়েছে। পর্যটকের সংখ্যা বিবেচনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হওয়া দরকার।'
খুলনা থেকে আসা পর্যটক নাজমুল হাসান বলেন, 'অনেকেই সেলফি তুলতে গিয়ে বা ভিডিও করতে গিয়ে বিপদে পড়েন। এ বিষয়ে সৈকতে নিয়মিত প্রচারণা চালানো প্রয়োজন। কারণ অধিকাংশ দুর্ঘটনা অসচেতনতার কারণেই ঘটে বলে আমার মনে হয়।'
বরিশাল থেকে আসা পর্যটক শারমিন সুলতানা বলেন, 'হোটেলে ওঠার সময় যদি একটি নিরাপত্তা নির্দেশিকা দেওয়া হতো, তাহলে অনেক পর্যটক আগে থেকেই ঝুঁকির বিষয়গুলো জানতে পারতেন। এতে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হতো।'
চট্টগ্রাম থেকে আসা পর্যটক মাহবুবুর রহমান বলেন, 'কক্সবাজার দেশের সবচেয়ে বড় পর্যটন কেন্দ্র। কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এখানকার ভাবমূর্তিও আরও উজ্জ্বল হবে।'
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী ও প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড বাহিনী গঠন এখন আর বিকল্প নয়, এটা সময়ের দাবি।
হোটেল থেকে সৈকত- কোথাও নেই সতর্কতা:
কক্সবাজারে পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও গেস্ট হাউসে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক রাত কাটান। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের কোথাও নেই সমুদ্রস্নান সংক্রান্ত কোনো নিরাপত্তা নির্দেশিকা। চেক-ইনে নেই ব্রিফিং, কক্ষে নেই লিফলেট, লবিতে নেই সাইনবোর্ড।
নরসিংদী থেকে আসা পর্যটক মো. রুবেল হোসেন বলেন, 'সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই শুনি কক্সবাজারে পর্যটক ভেসে যাওয়ার খবর। কিন্তু এখানে এসে দেখলাম সচেতনতা তৈরির তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। নিয়মিত মাইকিং ও নিরাপত্তা নির্দেশনা থাকলে মানুষ আরও সতর্ক হতো।'
কুমিল্লা থেকে আসা পর্যটক ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, 'সমুদ্রের ঢেউ দেখলে অনেকেই উত্তেজিত হয়ে গভীর দিকে চলে যান। কিন্তু কোথা থেকে বিপদ শুরু হতে পারে, সেটা সাধারণ পর্যটকদের জানা থাকে না। তাই সৈকতের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড থাকা প্রয়োজন।'
হোটেল ওশান প্যারাডাইসের পিআরও সায়ীদ আলমগীর বলেন, 'হাতে গোনা কয়েকটি হোটেল ছাড়া অধিকাংশ আবাসিক প্রতিষ্ঠানে পর্যটকদের সমুদ্রস্নান বিষয়ে কোনো নিরাপত্তা নির্দেশনা দেওয়া হয় না। তাঁর মতে, সরকারিভাবে হোটেলগুলোকে নির্দেশিকা দেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং তদারকির জন্য একটি মনিটরিং সেল গঠন করা দরকার।'
তার ভাষ্য, 'এসব দুর্ঘটনার দায় শুধু সরকারের নয়। হোটেল মালিক ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে।'
সি-সেইফের প্রজেক্ট কর্মকর্তা মো. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, 'সারা বছর অপেক্ষার পর পর্যটকরা কক্সবাজারে আসেন, আবেগের বশে নেমে পড়েন সমুদ্রে। কিন্তু সাগরের প্রকৃতি ও ঝুঁকি সম্পর্কে তাঁদের কোনো ধারণাই নেই।'
তার মতে, পর্যটকরা যখন বাসে বা ট্রেনে কক্সবাজারের পথে থাকেন, তখন থেকেই সতর্কবার্তা শুরু হওয়া উচিত। হোটেলে চেক-ইন থেকে সৈকতে নামার আগ পর্যন্ত ধাপে ধাপে সচেতন করা গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কমবে।
জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান জানালেন, লাইফগার্ডের সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ উন্নয়ন ও আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে, মন্ত্রণালয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু আশ্বাস আর বাস্তবতার মাঝে ফারাকটা তখনও স্পষ্ট। ১২০ কিলোমিটারের বিপরীতে দেড় কিলোমিটারের সুরক্ষা, লক্ষাধিক পর্যটকের বিপরীতে ২৭ জন লাইফগার্ড- এই হিসাব কোনো যুক্তিতেই মেলে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাগর প্রতিদিন একই থাকে- বিশাল, উদার, আর নির্মম। যে ঢেউ আনন্দের, সে ঢেউই কখনো কখনো শেষ ঢেউ হয়ে যায়। পার্থক্য গড়ে দেয় একটিমাত্র জিনিস- সচেতনতা আর সুরক্ষার ব্যবস্থা। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতে সেই ব্যবস্থা আজও পর্যাপ্ত নয়। তাই প্রতিটি মৌসুমে নতুন কোনো পরিবার ফিরে যায় শূন্য হাতে- যে মানুষটিকে নিয়ে এসেছিলেন, তাকে ছাড়াই।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর