গভীর রাতে ইরানের একাধিক স্থানে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হরমুজ প্রণালিতে একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনার জেরে মার্কিন বাহিনী এই হামলা চালায়। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কেশম দ্বীপ, জাস্ক, সিরিক ও বন্দর আব্বাসে দফায় দফায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
ওয়াশিংটন বলছে, ইরানের ‘অযৌক্তিক আগ্রাসনের’ জবাবে নেয়া পদক্ষেপ ছিল এটি। তবে তেহরান পাল্টা প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার পর ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ঘটনার পর তেহরানও পাল্টা জবাব দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বুধবার (১০ জুন) ইরানের স্থানীয় সময় রাত দেড়টার দিকে এই হামলা শুরু হয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই হামলা ছিল ‘ইরানের অযৌক্তিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সমানুপাতিক জবাব’।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, প্রথম দফা হামলায় হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপ এবং সিরিক ও জাস্ক বন্দরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পরে ইরানের স্থানীয় সময় বুধবার ভোররাত সাড়ে তিনটার দিকে জাস্কে এবং ভোর সাড়ে চারটার দিকে বন্দর আব্বাসে আরও হামলা ও বিস্ফোরণের খবর জানানো হয়।
এর আগে মঙ্গলবার (৯ জুন) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে হেলিকপ্টার ভূপাতিতের জন্য ইরানকে দায়ী করেন। নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে দেয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, হরমুজ প্রণালির ওপর টহল দেয়ার সময় ইরান হেলিকপ্টারটি ভূপাতিত করেছে।
তিনি বলেন, এই হামলার জবাব দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘অপরিহার্য’। ট্রাম্প আরও জানান, হেলিকপ্টারের দুই ক্রু সদস্যকেই নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে।
পরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ইরানের ভূখণ্ডের কাছাকাছি অবস্থানরত বিদেশি সামরিক বাহিনী ‘সবসময় ঝুঁকির মধ্যে’ রয়েছে। পরে তিনি নতুন মার্কিন হামলার জবাব দেয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন।
এক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ইরানি বাহিনী কোনও হামলা বা হুমকির জবাব না দিয়ে ছাড়বে না। নিরাপদ থাকতে চাইলে আমাদের অঞ্চল ছেড়ে যান।’
এদিকে হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়া এবং পরবর্তী মার্কিন হামলার ঘটনায় দুই মাসের যুদ্ধবিরতি আরও নাজুক হয়ে পড়েছে। এর আগের দিনই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর প্রথমবারের মতো ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছিল।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন মঙ্গলবার জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিটের অন্তত দুই সদস্য নিহত হয়েছেন।
এছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলেছে। এতে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের মূল্যও বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে স্থায়ী সমঝোতার লক্ষ্যে আলোচনা এখনও অনেকটাই ধীরগতিতে এগোচ্ছে। বিশেষ করে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান আরও জোরদার হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক অ্যালান ফিশার জানিয়েছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনীর ধারণা, ওমান উপকূলের কাছে একটি ইরানি শাহেদ ড্রোন মার্কিন ওই অ্যাপাচি হেলিকপ্টারটি ভূপাতিত করেছে। শাহেদ ড্রোন একমুখী আক্রমণের জন্য ব্যবহৃত হয়।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের অভিযানে প্রথমবারের মতো একটি চালকবিহীন ড্রোন নৌযান ঘটনাস্থলে পাঠানো হয় এবং দুই ঘণ্টার মধ্যেই দুই পাইলটকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
ট্রাম্প মার্কিন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, হেলিকপ্টার ভূপাতিত হলেও দুই সেনাসদস্যই ‘নিরাপদ এবং অক্ষত’ রয়েছেন।
তেহরান থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক মোহাম্মদ ভাল জানিয়েছেন, নতুন মার্কিন হামলা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। তিনি বলেন, ‘এখন কূটনীতি অগ্রাধিকার পাবে কি না, তা আমরা জানি না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া কিছু প্রস্তাব বর্তমানে ইরানে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’
তার ভাষায়, ‘ইরান সবসময় বলেছে যে তারা কূটনীতি ও আলোচনার দরজা খোলা রেখেছে। তবে একই সঙ্গে তারা বলে, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত রেখেছে এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে, যেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হচ্ছে না।’
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর