বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায়, বিসিএস হেলথ ক্যাডার এসোসিয়েশন চিকিৎসক ও চিকিৎসালয় নিরাপত্তা এবং দেশের আপামর জনগণের মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিকট একটি সমন্বিত ১৭ দফা প্রস্তাবনা উপস্থাপন করছে।
গতকাল ১৫ই জুন ২০২৬ইং সোমবার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ হলে এ প্রস্তাবনা তুলে ধরেন বিসিএস হেলথ ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের অর্থ সম্পাদক ডা. খালেদ আহমেদুর রহমান। এই সময় উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় কার্যকরী নির্বাহী পরিষদের সম্মানিত সভাপতি, ডা. মোঃ নেয়ামত হোসেন। আরো বক্তব্য রাখেন ডা. স্বর্ণা সহ আরো অনেকেই।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত গত পাঁচ দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তাহীনতা, জনবল সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এসব সমস্যা সমাধানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি সমন্বিত ১৭ দফা প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রস্তাবনায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘হেলথ পুলিশ’ গঠন, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, হাসপাতালভিত্তিক নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালীকরণ, হামলার ঘটনায় রাষ্ট্রীয় মামলা বাধ্যতামূলক করা এবং ডিজিটাল ইমার্জেন্সি রেসপন্স সিস্টেম চালুর দাবি জানানো হয়।
এছাড়া স্বাস্থ্যখাতে আধুনিক অর্গানোগ্রাম প্রণয়ন, শূন্যপদে দ্রুত জনবল নিয়োগ, প্রয়োজনভিত্তিক নতুন পদ সৃষ্টি, ন্যায়ভিত্তিক পদোন্নতি নিশ্চিতকরণ এবং সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ‘কোড ব্লু’ সেবা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, আমাদের লক্ষ্য আমাদের চিকিৎসকদের তথা সকল স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে জনগণের জন্য আরও উন্নত, মানবিক ও টেকসই স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।সরকারের নিকট “বিসিএস হেলথ ক্যাডার এসোসিয়েশন”- এর প্রস্তাবনাঃ
১) স্বাস্থ্য কর্মীদের নিরাপত্তায়ঃ
ক) স্বাস্থ্য পুলিশ (Health Police) গঠন ও হাসপাতালভিত্তিক নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালীকরণ করতে হবে
খ) চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী সুরক্ষা আইন (Healthcare Worker Protection Act) প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন করতে হবে
গ) ডিজিটাল ইমার্জেন্সি রেসপন্স সিস্টেম চালু করতে হবে
ঘ) হাসপাতালে দর্শনার্থী নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে
ঙ) হামলার ঘটনায় রাষ্ট্রীয় মামলা বাধ্যতামুলক ভাবে করতে হবে
চ) স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য মানসিক ও আইনি সহায়তা সেল চালু করা
ছ) নিয়মিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে
জ) জনসচেতনতা কার্যক্রম গ্রহণ“চিকিৎসক ও রোগী প্রতিপক্ষ নয়, সহযোদ্ধা”- এই বার্তা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে।
উদ্দেশ্য— স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, চিকিৎসা সেবার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এবং একটি সহিংসতামুক্ত হাসপাতাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা ও জনগণকে নিরবিচ্ছিন্ন সেবা প্রদান করা।
২) সকল স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের আধুনিক অর্গানোগ্রাম প্ৰণয়নঃউদ্দেশ্য একটাই- সীমিত জনবল দিয়ে অতিরিক্ত চাপ নয়; বরং বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার মাধ্যমে নিরাপদ, মানসম্মত ও টেকসই স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
৩) ক্যাডার সার্ভিসের আইন, জ্যেষ্ঠতা, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি নিশ্চিতকরণ করতে হবে।
৪) স্বাস্থ্যখাতে প্রয়োজনভিত্তিক নতুন পদসৃষ্টি (Creation of Posts) নিশ্চিতকরণ। উদ্দেশ্য- চিকিৎসা সেবার মান বৃদ্ধি, কর্মস্থলের চাপ হ্রাস এবং একটি টেকসই ও আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা। ফলে জনগণ সুন্দর পরিবেশে সেবা গ্রহণ করতে পারবে।
৫) শয্যা (Bed) সংখ্যার অতিরিক্ত রোগী ভর্তি বন্ধ এবং বাস্তবসম্মত রোগী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ। উদ্দেশ্য- নিরাপদ, মানসম্মত ও নিয়ন্ত্রিত রোগী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে চিকিৎসাসেবার গুণগত মান উন্নয়ন এবং চিকিৎসক-রোগী উভয়ের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে হবে।
৬) বহির্বিভাগে একজন চিকিৎসকের জন্য দৈনিক রোগী দেখার যৌক্তিক সীমা নির্ধারণ (প্রতি চিকিৎসক সর্বোচ্চ ৪০ জন রোগী)। উদ্দেশ্য- প্রতিটি রোগীকে পর্যাপ্ত সময় ও মনোযোগ দিয়ে নিরাপদ, মানবিক ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা; চিকিৎসকদের ওপর অযৌক্তিক কর্মচাপ কমানো এবং একটি কার্যকর, রোগীবান্ধব ও টেকসই স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
৭) সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্ন সকল শূন্যপদে দ্রুত সময়ের মধ্যে জনবল নিয়োগ নিশ্চিতকরণ করতে হবে।উদ্দেশ্য- জনবল ঘাটতির জন্য প্রয়োজনীয় জনসেবা বিঘ্নিত হচ্ছে। সুতরাং, শূন্যপদের কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি দূর করে একটি কার্যকর, শক্তিশালী ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
৮) সকল সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে “Code Blue” সেবা চালু ও কার্যকর বাস্তবায়ন করতে হবে।উদ্দেশ্য- সংকটময় মুহূর্তে দ্রুত সাড়া, সমন্বিত চিকিৎসা এবং প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কমিয়ে নিরাপদ ও মানসম্মত হাসপাতাল সেবা নিশ্চিত করা।
৯) জরুরি বিভাগ, ট্রমা সেন্টার, ICU, CCU, ডায়ালাইসিস ইউনিটসহ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকি ভাতা (Risk Allowance) প্রদান নিশ্চিতকরণ করতে হবে।উদ্দেশ্য— উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীদের ন্যায্য আর্থিক স্বীকৃতি প্রদান, কর্মপ্রেরণা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
১০) ঈদসহ সকল সরকারি ও নির্বাহী আদেশে ছুটির সময় দায়িত্ব পালনকারী স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশেষ ভাতা (Holiday Duty Allowance) প্রদান নিশ্চিতকরণউদ্দেশ্য- ছুটির দিনেও নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনকারী স্বাস্থ্যকর্মীদের ন্যায্য স্বীকৃতি ও প্রণোদনা প্রদান।
১১) স্বাস্থ্যকর্মীদের জরুরী ও ন্যায্য ছুটি বাতিলের সংস্কৃতি বন্ধ করা ও ন্যায়ভিত্তিক ছুটি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ করতে হবে উদ্দেশ্য— স্বাস্থ্যকর্মীদের মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, পেশাগত ভারসাম্য রক্ষা করা এবং সেবার গুণগত মান বজায় রাখা।
১২) চিকিৎসকসহ সকল পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সরকারি খরচে দেশে ও বিদেশে নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিশ্চিতকরণউদ্দেশ্য— দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলে নিরাপদ, আধুনিক ও রোগীবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক মানের সাথে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সমন্বিত করা ও দেশের জনগণকে বিশ্বমানের সেবা নিশ্চিত করা।
১৩) চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নের লক্ষ্যে বিদেশ ভ্রমণ প্রক্রিয়া সহজীকরণ করতে হবে।উদ্দেশ্য- আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সম্প্রসারণ করে দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করা।
১৪) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও এর আওতাধীন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য রেশন ব্যবস্থা চালুকরণউদ্দেশ্য- স্বাস্থ্যসেবা একটি অত্যাবশ্যকীয় (Essential) রাষ্ট্রীয় সেবা। এই সেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় রাখা, আর্থিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং কর্মপ্রেরণা জোরদার করার লক্ষ্যে একটি টেকসই ও কল্যাণমুখী রেশন ব্যবস্থা চালু করতে হবে
১৫) চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পদায়নের সুনির্দিষ্ট, স্বচ্ছ ও ন্যায়ভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নউদ্দেশ্য- সুনির্দিষ্ট পদায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলে স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতা, কর্মপরিবেশের স্থিতিশীলতা এবং সেবার মান নিশ্চিত করা।
১৬) স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের সাথে চিকিৎসকদের “প্রতিপক্ষ” নয়, “সহযোগী অংশীদার” হিসেবে সম্পর্ক নিশ্চিতকরণউদ্দেশ্য- স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দ্বন্দ্ব নয়, সহযোগিতা নিশ্চিত করা; যাতে চিকিৎসক ও জনপ্রতিনিধি উভয়ে মিলে রোগীর কল্যাণে কাজ করতে পারেন এবং একটি স্থিতিশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে ওঠে ও দেশের জনগণ তার অধিকার অনুযায়ী স্বাস্থ্য সেবা পায় ।
১৭) স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্ট তথ্য ও সংবাদ পরিবেশনে তথ্যের যথার্থতা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং সমন্বয জোরদার করতে হবে ।উদ্দেশ্য- স্বাস্থ্যসেবা একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট খাত। তাই স্বাস্থ্যখাত সংক্রান্ত সংবাদ ও তথ্য পরিবেশনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্ভুল ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য উপস্থাপন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
“বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত আরও শক্তিশালী হোক, জনগণের স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ ও মানবিক হোক” – এই প্রত্যাশা আমাদের।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর