সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) কর্মরত পাকিস্তানি শিয়া মুসলিমদের একটি অংশ অভিযোগ করেছেন, তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে চাকরি হারাতে হচ্ছে এবং অনেককে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বহু প্রবাসীর ব্যাংক হিসাব জব্দ করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনপিআরের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইউএইতে কর্মরত বহু পাকিস্তানি শিয়া মুসলিমকে হঠাৎ করে পুলিশ স্টেশনে হাজির হতে বলা হয়। পরে তাদের আটক করে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। অনেকেই জানিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধ বা অভিযোগের কথা জানানো হয়নি।
প্রবাসীদের অভিযোগ, নিরাপত্তা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই শিয়া মসজিদ ও ধর্মীয় কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে। দুবাইয়ে ট্যাক্সিচালক হিসেবে কর্মরত এক পাকিস্তানি শিয়া বলেন, তিনি নিয়মিত ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পর থেকেই নজরদারির মধ্যে ছিলেন এবং পরে তাকে বহিষ্কার করা হয়।
পাকিস্তানের কয়েকজন আইনপ্রণেতা ও শিয়া সম্প্রদায়ের নেতাদের দাবি, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে কয়েক হাজার শিয়া মুসলিমকে ইউএই থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে এই সংখ্যা ৫ হাজার থেকে ১৮ হাজারের মধ্যে হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
বহিষ্কৃতদের মধ্যে আরসালান হুসেইন বুখারি নামে এক ব্যক্তি জানান, তাকে হঠাৎ একটি ফোনকলের মাধ্যমে পুলিশ স্টেশনে যেতে বলা হয়। পরে তাকে একটি আটক কেন্দ্রে নেওয়া হয়, যেখানে হাজারো মানুষকে বহিষ্কারের অপেক্ষায় রাখা হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন, সেখানে তাদের অপমানজনক আচরণের শিকার হতে হয়েছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক বহিষ্কৃত প্রবাসী দেশে ফিরে এসে দেখেছেন তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। ফলে বছরের পর বছর পরিশ্রম করে জমানো অর্থও তারা তুলতে পারছেন না। কেউ কেউ চাকরি, ব্যবসা, ব্যক্তিগত মালপত্র এবং সঞ্চয় হারিয়ে নিঃস্ব অবস্থায় পাকিস্তানে ফিরেছেন।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে শতাধিক শিয়া মুসলিম প্রবাসী ইউএই থেকে ফেরত এসেছেন, যাদের অনেকেই নিজেদের সঞ্চয় বা ব্যক্তিগত মালপত্র সঙ্গে আনতে পারেননি। পাকিস্তানের শিয়া রাজনৈতিক সংগঠন মজলিস-এ-ওয়াহদাত-এ-মুসলিমিনের দাবি, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত ৭,৫০০ শিয়া মুসলিমকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইউএই কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলেছে, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে বহিষ্কার করা হয়নি; বরং ইউএইর আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের কারণেই বহিষ্কারের ঘটনা ঘটেছে। তবে মানবাধিকার সংস্থা Human Rights Watch অভিযোগগুলো তদন্ত করছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট উত্তেজনা এবং পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থান এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বহিষ্কৃতদের অনেকেই দাবি করেছেন, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, ইরান সফর এবং ইরানের নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল।
বর্তমানে প্রায় ১৮ লাখ পাকিস্তানি ইউএইতে বসবাস ও কাজ করেন এবং প্রতিবছর কয়েক বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠান। ফলে এই বহিষ্কার ও ব্যাংক হিসাব জব্দের অভিযোগ শুধু মানবিক সংকটই নয়, পাকিস্তানের অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
সর্বশেষ খবর