ইরানকে কেন্দ্র করে কয়েক মাসের অস্থিরতার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারে স্বস্তির আভাস দেখা যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন স্বাভাবিক হওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ বাড়ার প্রত্যাশায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত কমছে। ফলে ব্রেন্ট ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) উভয় ধরনের তেলের দাম প্রায় যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ে ফিরে এসেছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে আগস্টে সরবরাহযোগ্য ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ০৬ ডলার বা ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ কমে ৭২ দশমিক ৬৮ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ৭৬ সেন্ট বা ১ দশমিক ০৮ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ব্যারেলপ্রতি ৬৯ দশমিক ৫৮ ডলারে। এর ফলে দুই ধরনের তেলের দামই ২৭ ফেব্রুয়ারির পর সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে সরবরাহযোগ্য ব্রেন্টের দাম বেশি থাকায় বাজারে স্বল্পমেয়াদে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহের ইঙ্গিত মিলছে। আইজি গ্রুপের বিশ্লেষক টনি সাইকামোর বলেন, বাজার মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে বলে ধরে নিচ্ছে।
এর আগে বুধবারও ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই—উভয় ধরনের তেলের দাম প্রায় ৩ ডলার করে কমে যায়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন এখন যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থার কাছাকাছি পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এই প্রণালি দিয়ে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছে। তবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে, কারণ কিছু এলাকায় এখনও মাইন অপসারণের কাজ চলছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার সম্ভাবনায় ইরানের তেল রপ্তানি বাড়তে পারে—এমন প্রত্যাশাও তেলের দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিয়ে একটি প্রাথমিক সমঝোতা হওয়ার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হয়েছে। সমঝোতা অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বিভিন্ন জটিল ইস্যুতে আগামী ৬০ দিন আলোচনা চলবে।
ক্রিস রাইটের ভাষ্য, চুক্তি ভেঙে গেলেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন অব্যাহত থাকবে এবং ইরান আর এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ করতে পারবে না।
এদিকে ট্যাংকার চলাচল সহজ করতে বুধবার হরমুজ প্রণালিতে অস্থায়ী নৌপথ চালু করেছে ওমান। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) ও ওমানের কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে জাহাজ চলাচল সমন্বয় করছে। একইসঙ্গে কাতারের প্রধানমন্ত্রী ওমান সফর করে ইরান, ইরাক ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
ম্যাককোয়ারি ব্যাংকের বিশ্লেষকদের ধারণা, নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া এবং হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে যাওয়ার পর তেলের দাম দ্রুত যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ে ফিরে আসবে। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ৬৭ ডলার এবং ডব্লিউটিআইয়ের গড় দাম ৬২ ডলারে নেমে আসতে পারে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে এই গড় দাম ছিল যথাক্রমে ৯৪ ও ৮৭ ডলার।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ) জানিয়েছে, গত সপ্তাহে দেশটির মোট অপরিশোধিত তেলের মজুত ১৯৮৪ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। শোধনাগারের চাহিদা বৃদ্ধি এবং জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড় করাই এর প্রধান কারণ।
তবে বাজারে এই তথ্যের তেমন প্রভাব পড়েনি। কারণ বিনিয়োগকারীদের মূল নজর ছিল হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির দিকে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর