ইউরোপের দেশ নরওয়েতে ধর্মীয় জনসংখ্যার চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। একদিকে ঐতিহ্যবাহী চার্চ অব নরওয়ে -এর সদস্য সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে, অন্যদিকে দেশটিতে দ্রুত বাড়ছে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা। নরওয়ের জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা স্ট্যাটিস্টিক্স নরওয়ে (এসএসবি) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য এমন চিত্রই তুলে ধরেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন দশকে চার্চ অব নরওয়ের সদস্য সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ১৯৯৪ সালে দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৫ শতাংশ এই চার্চের সদস্য ছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালে সেই হার নেমে এসেছে ৬২ শতাংশে। শুধু ২০২৪ সালেই প্রায় ১৫ হাজার মানুষ চার্চের সদস্যপদ থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মীয় পরিচয়ে পরিবর্তনের পাশাপাশি নরওয়েজিয়ান সমাজে ধর্মনিরপেক্ষতা বৃদ্ধি এবং নতুন প্রজন্মের জীবনধারার পরিবর্তনও এই প্রবণতার অন্যতম কারণ।
অন্যদিকে, চার্চের বাইরে বিভিন্ন ধর্মীয় ও জীবনদর্শনভিত্তিক সংগঠনের সদস্য সংখ্যা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। গত এক বছরে এসব সংগঠনে নতুন করে প্রায় ১৮ হাজার সদস্য যুক্ত হয়েছেন। ফলে চার্চ অব নরওয়ের বাইরের ধর্মীয় ও জীবনদর্শনভিত্তিক সংগঠনগুলোর মোট নিবন্ধিত সদস্য সংখ্যা এখন ৭ লাখ ৭৫ হাজারেরও বেশি।
স্ট্যাটিস্টিক্স নরওয়ের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৪২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধর্মীয় বা জীবনদর্শনভিত্তিক সংগঠনের সঙ্গে নিবন্ধিত। যা নরওয়ের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৫ শতাংশ। তবে এই পরিবর্তনের পরও খ্রিস্টধর্ম দেশটির সবচেয়ে বড় ধর্ম হিসেবে রয়েছে। চার্চ অব নরওয়েসহ বিভিন্ন খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মোট সদস্য সংখ্যা এখনো ৩৮ লাখের বেশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে নরওয়েতে সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটছে মুসলিম সম্প্রদায়ের। শুধু গত এক বছরেই বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনে নতুন করে প্রায় ৭ হাজার সদস্য যুক্ত হয়েছেন।
দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যানও মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০০৬ সালে নরওয়েতে নিবন্ধিত মুসলিমের সংখ্যা ছিল মাত্র ৭২ হাজার। বর্তমানে (২০২৬) সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজারে পৌঁছেছে, যা দেশটিতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধারাবাহিক বৃদ্ধিরই প্রতিফলন।
স্ট্যাটিস্টিক্স নরওয়ের উপদেষ্টা আন্দ্রেয়া ইহলার ইভেনসেন বলেন, নিবন্ধিত সদস্যের সংখ্যা থেকে দেশটির মানুষের ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা পাওয়া গেলেও এটি সব সময় ব্যক্তির প্রকৃত বিশ্বাসকে পুরোপুরি তুলে ধরে না। অনেকেই কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সদস্য না হয়েও ধর্মবিশ্বাস ধারণ করেন। আবার কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে ধর্মচর্চা না করলেও পারিবারিক ঐতিহ্য বা সাংস্কৃতিক কারণে চার্চ কিংবা অন্য ধর্মীয় সংগঠনের সদস্য হিসেবে নিবন্ধিত থাকেন।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, নরওয়ের এই পরিবর্তন দেশটির সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন। অভিবাসন, বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার কারণে দেশটি ধীরে ধীরে আরও বহুত্ববাদী সমাজে পরিণত হচ্ছে। ফলে খ্রিস্টান, মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্ম ও জীবনদর্শনের অনুসারীরা সমানভাবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছেন।
তবে পরিবর্তনের এই ধারার মধ্যেও খ্রিস্টধর্ম নরওয়ের প্রধান ধর্ম হিসেবেই রয়েছে। একই সঙ্গে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধারাবাহিক বৃদ্ধি দেশটির ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করছে এবং ভবিষ্যতে নরওয়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: দ্য জেরুজালেম পোস্ট
রোহান/সা.এ.
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর