বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের অধীনে গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বিরুদ্ধে উঠেছে গ্রাহক পর্যায়ে ঘুষ বাণিজ্য, অতিরিক্ত ও 'ভূতুড়ে' বিল আদায়, টেন্ডারে অনিয়ম, দীর্ঘ লোডশেডিং এবং ঠিকাদার নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ। "আলো ঘরে ঘরে, প্রগতি দেশে দেশে" স্লোগান সামনে রেখে কাজ করার কথা থাকলেও এই সমিতির বিরুদ্ধে অতীতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সমন্বিত কার্যালয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করেছেন গ্রাহকরা।
স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে মিনি ঠিকাদার তালিকাভুক্তকরণ ও নবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি, গোপনীয়তা এবং আর্থিক লেনদেন হচ্ছে। যোগ্যতাসম্পন্ন স্থানীয় ঠিকাদারদের বাদ দিয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জেলার বাইরের নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই দুর্নীতির কারণে একদিকে যেমন গ্রামীণ জনগণের সেবায় নিয়োজিত এ প্রতিষ্ঠানটি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের "আলো ঘরে ঘরে" প্রকল্প বাস্তবায়নের গতিও কমছে।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, তদবির এবং একই কর্মস্থলে বছরের পর বছর ধরে অবস্থান করে নিজেদের শক্ত করে নিয়েছে ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সিন্ডিকেটের সদস্যরা। ডিজিএম কারিগরি লুৎফুল হাসান, সহকারী জেনারেল ম্যানেজার নাহিদ ইসলাম এবং সাবেক জিএম আসাদুজ্জামান খানের নাম এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে স্বল্প দৈর্ঘ্য, লাইন নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও আপগ্রেডেশন কাজের জন্য গত বছরের মাঝামাঝি মিনি ঠিকাদার প্রাথমিক তালিকাভুক্তির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পূর্বের তালিকাভুক্ত কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা তাদের পছন্দমতো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করতে বাধা সৃষ্টি করেন। তালিকাভুক্তির জন্য ১৭২টি আবেদনের বিপরীতে তৎকালীন জিএম আসাদুজ্জামান খান প্রথমে ৩১টি এবং পরে আরও ৮টি সহ মোট ৩৯টি প্রতিষ্ঠানের নাম অন্তর্ভুক্ত করেন, যাদের অধিকাংশই জেলার বাইরের ও অনেক দূরের প্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে নানা প্রশ্ন উঠলে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি রংপুর জোনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রেজাউল করিম ১৭২টি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা যাচাইয়ের মাধ্যমে তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য একটি নির্দেশনা দেন। তবে এই নির্দেশনা অমান্য করে সম্প্রতি গোপনেই ৩৯টি প্রতিষ্ঠানের নাম চূড়ান্ত করে ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। অভিযোগ উঠেছে, অবৈধ উপায়ে অর্থের বিনিময়ে পছন্দের গুটিকয়েক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সাময়িক তালিকাভুক্ত করার কারণে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় জেলার প্রায় ২০ লক্ষ সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়বে এবং এই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি থাকবে।
আরাফাত এন্টারপ্রাইজ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী এনামুল হক অভিযোগ করেন, "আমি স্বচ্ছতার সাথে অনেক বছর ধরেই এ প্রতিষ্ঠানে টেন্ডারের মাধ্যমে কাজ করে আসছি। কোনোদিন কাজের মান নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হইনি। এবারও নিয়ম মেনে প্রয়োজনীয় বিল পরিশোধ করে সব কাগজপত্র জমা দেই। আমাকে বাদ দিয়ে দূরের জেলার কোনো প্রতিষ্ঠান কীভাবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় তা আমার জানা নেই। সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (এজিএম ই এন্ড সি) নাহিদ ইসলাম আমাকে বড় বিএনপি নেতার সুপারিশ আনতে বলেন। তারপর নাকি কিছু করা যেতে পারে।"
অভিযোগের প্রেক্ষিতে সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (এজিএম ই এন্ড সি) নাহিদ ইসলাম এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। ডিজিএম (কারিগরি) লুৎফুল হাসান সরকারের কাছে বছরের পর বছর একই জায়গায় কর্মরত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আমার কাজের পারফরমেন্সের জন্যই হয়তো উপর থেকে আমাকে বারবার এখানে রেখেছে।" তবে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগের বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) আশরাফুল আলম খান বলেন, "মিনি ঠিকাদার নিয়োগের সার্কুলারটা অতীত এবং আগেই ক্লোজ হয়ে গিয়েছে। ১৭২ আবেদনের প্রেক্ষিতে ৩৯টি প্রতিষ্ঠান ইনলিস্টেড হয়েছে। অতীতে কীভাবে কী হয়েছে তা আমার জানা নেই।" তবে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যাচাই-বাছাইয়ে স্বচ্ছতা বা বাছাই কমিটির পক্ষপাতিত্বের বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দেননি।
সর্বশেষ খবর