হাতে দামি আইফোন, চলাচলে বিলাসবহুল গাড়ি। ঢাকায় নিয়মিত যাতায়াত করেন বিমানে। পোশাক-আশাক ও চালচলন দেখলে মনে হবে কোনো ধনকুবেরের সন্তান কিংবা প্রভাবশালী ব্যবসায়ী পরিবারের উত্তরাধিকারী। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন—তিনি একজন সাধারণ দিনমজুরের ছেলে, বয়সে এখনও হাইস্কুলের গণ্ডি পেরোননি। কিন্তু অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠায় কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালী এলাকায় এখন সবচেয়ে আলোচিত নাম ওসমান।
স্থানীয়দের অভিযোগ এবং বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ছাত্রজীবনেই সীমান্তভিত্তিক ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে পড়েন ওসমান। বর্তমানে তিনি সীমান্তকেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, পালংখালীর থাইংখালী ৩ নম্বর ওয়ার্ডের রহমতেরবিল সীমান্ত এলাকায় বেড়ে ওঠা ওসমান প্রথমে স্বল্প পরিসরে ইয়াবা বহনের কাজে যুক্ত হন। পরে সীমান্তঘেঁষা অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে অস্ত্রধারী একটি রোহিঙ্গা মাদকচক্রের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন।
প্রায় দুই থেকে আড়াই বছর আগে সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা দেশে প্রবেশ করানোর কাজে একজন সাধারণ বাহক বা শ্রমিক হিসেবে একটি সংঘবদ্ধ মাদকচক্রের সঙ্গে যুক্ত হন ওসমান। শুরুতে তার দায়িত্ব ছিল সীমান্ত অতিক্রম করে আসা ইয়াবার চালান নির্ধারিত নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া। সীমান্তের দুর্গম পথ, গোপন রুট এবং মাদক পরিবহনের কৌশল সম্পর্কে দ্রুত অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। ধীরে ধীরে চক্রটির প্রতি বিশ্বস্ততা, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার সক্ষমতা এবং গোপনীয়তা রক্ষা করার কারণে মাফিয়া সিন্ডিকেটের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
মাদক সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, আস্থাভাজন হওয়ার পর শুধু বাহক হিসেবেই নয়, বরং সীমান্ত দিয়ে বড় বড় ইয়াবার চালান আনা, নিরাপদে সংরক্ষণ, বিভিন্ন স্তরের সদস্যদের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে পৌঁছে দেওয়া এবং পুরো নেটওয়ার্ক সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তার হাতে চলে আসে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজস্ব একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন এবং সীমান্তকেন্দ্রিক মাদক ব্যবসায় প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন। বর্তমানে তার মাধ্যমে নিয়মিত বড় আকারের ইয়াবার চালান দেশে প্রবেশ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই অবৈধ কারবার থেকেই অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন।
অনুসন্ধানে চোখ কপালে উঠার মতো ওসমানের নামে থাকা একাধিক সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। মাস দুয়েক আগে থাইংখালীর একটি ইটভাটার পাশে প্রায় ৩ একর জমি কেনেন তিনি। স্থানীয়দের হিসাবে প্রতি একরের মূল্য প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। শুধু এই জমির মূল্যই পাঁচ কোটি টাকার বেশি। এছাড়া থাইংখালীর জামতলী এলাকায় কবরস্থানের পাশে করিম নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে বাড়িসহ একটি ভিটা ৪৩ লাখ টাকায় কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। একইভাবে উত্তর রহমতেরবিল আশারপাড়া মসজিদের পাশে পালংখালীর আবুল ফয়েজের বোনের বাড়িসহ আরেকটি বসত ভিটা ক্রয় করেছেন প্রায় ৫০ লাখ টাকায়।
স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েক মাসেই এসব সম্পদ কেনা হয়েছে। শুধু এই তিনটি সম্পত্তির মূল্যই ছয় কোটির কাছাকাছি। এছাড়া তার ব্যবহারে রয়েছে পাঁচটি টিয়ারেক্স গাড়ি, একটি এক্সনোহা স্কয়ার গাড়ি, দামি মোটরসাইকেলসহ আরও বিভিন্ন সম্পদ। স্থানীয়দের দাবি, সব মিলিয়ে তার সম্পদের পরিমাণ শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
পালংখালীর রহমতের বিল এলাকার বাসিন্দা ওসমানের পারিবারিক পটভূমি ছিল অত্যন্ত সাধারণ। তিনি দিনমজুর আবুল কালাম-বুলবুল আক্তার দম্পতির ছেলে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, আবুল কালাম দীর্ঘদিন ধরে দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক এবং বিভিন্ন কোল্ডস্টোরে চিংড়ির মাথা ছেঁড়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। অতি স্বল্প আয়ের কারণে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটি জরাজীর্ণ ঘরে মানবেতর জীবন কাটাতে হতো তাদের। সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হতো, সেখানে পরিবারের এক সন্তানের অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়ে বিলাসবহুল জীবনযাপন শুরু করায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও ওসমানের জীবনযাত্রা ছিল একেবারেই সাধারণ। কিন্তু হঠাৎ করেই তার হাতে দামি মোবাইল ফোন, বিলাসবহুল গাড়িতে চলাফেরা, বিপুল অর্থের লেনদেন এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ওঠাবসা শুরু হয়। তার এই আকস্মিক উত্থানকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এলাকার সচেতন বাসিন্দাদের অভিযোগ, বৈধ কোনো ব্যবসা বা দৃশ্যমান আয়ের উৎস না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এত অল্প সময়ে তিনি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হলেন, তার কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, ওসমান শুধু এককভাবে নয়, বরং একটি সুসংগঠিত অস্ত্রধারী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেটে অন্তত ছয়জন সক্রিয় সদস্য রয়েছে এবং প্রত্যেকের কাছেই বিদেশি ৯ এমএম পিস্তল থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, অস্ত্রের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে তারা সীমান্ত এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখে এবং ইয়াবা পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।
গত ১৩ জুন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অভিযানে সেই অভিযোগের আংশিক সত্যতাও সামনে আসে বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন। বিজিবি সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য ফয়সালের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৫০ হাজার ইয়াবা, দুটি বিদেশি পিস্তল, পাঁচ রাউন্ড গুলি, একটি চাপাতি, দুটি স্টিক ও একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। এ সময় ফয়সালকে গ্রেপ্তার করা হয়। স্থানীয়দের মতে, ওই অভিযানের পর সিন্ডিকেটটির অস্ত্র ও মাদকনির্ভর কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হলেও, মূল হোতাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় এখনও নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্যের সঙ্গে ওসমানের সিন্ডিকেটের যোগাযোগ রয়েছে। নিয়মিত আর্থিক সুবিধা দেওয়ার কারণেই তিনি বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরেই ইয়াবা পাচারের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে পরিচিত। মিয়ানমার থেকে আসা মাদকের চালান সীমান্তবর্তী বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে দেশে প্রবেশ করে এবং স্থানীয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ওসমানের মতো তরুণদের দ্রুত উত্থান প্রমাণ করে মাদক ব্যবসা এখন শুধু অভিজ্ঞ অপরাধীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সহজে অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে কিশোর-তরুণদেরও এই চক্রে টেনে নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, সীমান্তের শীর্ষ মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত ইয়াবা পাচার বন্ধ করা সম্ভব হবে না। সীমান্তজুড়ে নতুন নতুন সিন্ডিকেট গড়ে ওঠা, বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া এবং অস্ত্রের বিস্তার পুরো এলাকাকে উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছে।
একজন দিনমজুরের পরিবারের কিশোর কীভাবে অল্প সময়ে কোটি কোটি টাকার সম্পদ, বিলাসবহুল গাড়ি ও প্রভাবের মালিক হয়ে উঠলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। এ বিষয়ে ওসমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। একইভাবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও এখনো পাওয়া যায়নি।
রোহান/সা.এ.
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর