রোগীর জন্য সরকারি বরাদ্দ ১৯০ গ্রাম মাংস। কিন্তু থালায় উঠছে মাত্র ২৫ থেকে ৪০ গ্রাম। গাইবান্ধা জেলা সদর হাসপাতালের রান্নাঘরে ঢুকে নিজ হাতে মাংস ওজন করিয়ে এমন চাঞ্চল্যকর অনিয়মের প্রমাণ পান গাইবান্ধা-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল করিম। শুধু মাংস নয়, ডাল-সবজিসহ প্রায় সব ধরনের রোগীর পথ্যেই অনিয়মের অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
পরিদর্শনের একপর্যায়ে তিনি সরাসরি হাসপাতালের রান্নাঘরে প্রবেশ করেন। সেখানে রোগীদের জন্য রান্না করা ব্রয়লার মুরগির মাংস ওজন করালে একটি টুকরার ওজন পাওয়া যায় মাত্র ৪০ গ্রাম। পরে আরও পাঁচটি টুকরা ওজন করলে সেগুলোর ওজন ২৫ থেকে ৩৫ গ্রামের মধ্যে পাওয়া যায়। অথচ সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী একজন রোগীর জন্য ১৯০ গ্রাম মাংস সরবরাহ করার কথা।
এ দৃশ্য দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে এমপি আব্দুল করিম বলেন, সরকার রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিচ্ছে। কিন্তু এখানে সেই বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। শুধু মাংস নয়, ডাল-সবজিসহ প্রায় সব ধরনের খাবারেই অনিয়ম রয়েছে। গতকাল রোববার (৫ জুলাই) দুপুরে আকস্মিকভাবে জেলা সদর হাসপাতাল পরিদর্শনে এসে প্রায় দুই ঘণ্টা বিভিন্ন ওয়ার্ড, রান্নাঘর ও হাসপাতাল চত্বর ঘুরে দেখেন সংসদ সদস্য।
এসময় তিনি আরও জানান, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কাছে একাধিকবার রোগীদের দৈনিক খাবারের রুটিন দেখতে চাইলেও তা দেখানো হয়নি। পরে তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. শহিদুল্লাহকে সরকারি বরাদ্দ ও নির্ধারিত ওজন অনুযায়ী রোগীদের খাবার পরিবেশনের নির্দেশ দেন।
এমপি বলেন, "আজ রাত থেকেই যেন সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী রোগীদের খাবার দেওয়া হয়। কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না।"
অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. শহিদুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, "হাসপাতালে আড়াইশ রোগীর জন্য খাবারের বরাদ্দ থাকলেও বর্তমানে প্রায় চারশ রোগীকে খাবার দিতে হচ্ছে। তবে আজ রাত থেকেই খাবারের সঠিক ওজন নিশ্চিত করা হবে।"
তবে আড়াইশ রোগীর খাবার চারশ রোগীকে দেওয়া হলেও ১৯০ গ্রামের জায়গায় মাত্র ২৫-৩০ গ্রাম মাংস কেন দেওয়া হচ্ছে—এ প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি তিনি।
পরিদর্শনের সময় হাসপাতাল চত্বরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মেডিকেল বর্জ্য দেখেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, দুপুর সাড়ে ১২টা পেরিয়ে গেলেও হাসপাতাল চত্বর থেকে বর্জ্য অপসারণ করা হয়নি। পরে তিনি মোবাইল ফোনে পৌর কর্তৃপক্ষকে দ্রুত বর্জ্য অপসারণের নির্দেশ দেন।
এ সময় চিকিৎসাধীন রোগী ও তাদের স্বজনরা এমপির কাছে অভিযোগ করেন, রাতের বেলায় হাসপাতালে মোবাইল ফোন চুরির ঘটনা প্রায় নিয়মিত। এমনকি একজন চিকিৎসকের মোবাইল ফোন চুরি হলেও তা উদ্ধার হয়নি। হাসপাতালের সিসি ক্যামেরাগুলোও দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর।
এছাড়া সম্প্রতি কোনো নিয়ম-নীতি অনুসরণ না করেই আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগের অভিযোগ ওঠে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ঠিকাদার ও তার প্রতিনিধির মাধ্যমে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পরিদর্শনের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক কর্মীকেই কর্মস্থলে অনুপস্থিত দেখতে পান সংসদ সদস্য।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এমপিকে জানান, জনবল সংকট ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে নবনির্মিত ৯ তলা ভবনটি এখনো পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে সংসদ সদস্য আব্দুল করিম বলেন, "আমি স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে একাধিকবার সংসদে বিষয়টি তুলে ধরেছি। প্রয়োজন হলে আবারও সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করব, যাতে দ্রুত হাসপাতালের সংকট দূর হয়।"
উল্লেখ্য, গাইবান্ধা সদর হাসপাতালটি জেলার সদর, সাঘাটা, সুন্দরগঞ্জ, গোবিন্দগঞ্জ, সাদুল্লাপুর, ফুলছড়ি ও পলাশবাড়ী উপজেলার প্রায় ২৬ লাখ মানুষের প্রধান চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র। সাম্প্রতিক এই অনিয়মের ঘটনায় রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর