টানা বর্ষণ কমেছে। পাহাড়ি ঢলের তীব্রতাও অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। তবু দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকায় কমছে না জলাবদ্ধতা। ভাটার পরও দিনের পর দিন বন্যার পানি আটকে থাকায় হাজার হাজার মানুষ মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি, মৎস্য ও লবণখাত। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠেছে, বৃষ্টি কমার পরও পানি নামছে না কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কেবল অতিবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢল নয়, মানবসৃষ্ট বাধাই এবার বন্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। মাছের ঘের, লবণচাষ ও মাছ ধরার জাল রক্ষার স্বার্থে প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী বিভিন্ন এলাকায় ইচ্ছাকৃতভাবে স্লুইস গেইট বন্ধ বা আংশিক বন্ধ করে রাখছে। কোথাও আবার খালের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে অসংখ্য অবৈধ বাঁধ। ফলে ভাটার সময়ও উজান থেকে নেমে আসা পানি স্বাভাবিক গতিতে মহেশখালী চ্যানেল হয়ে বঙ্গোপসাগরে পৌঁছাতে পারছে না। পানি আটকে থেকে সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বন্যায় জেলার ১০টি উপজেলার অন্তত ১৫০টি গ্রামের তিন লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। চকরিয়া, পেকুয়া, ঈদগাঁও, রামু, কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অনেক স্থানে পানি কমলেও নিম্নাঞ্চলের অসংখ্য গ্রামে এখনো পানি আটকে রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পানি নিষ্কাশনের মূল ভরসা সাংগু ও মাতামুহুরী নদী। বান্দরবানের পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢল এই দুই নদী হয়ে মহেশখালী চ্যানেল দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশে যায়। নদীগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত শত শত খাল এই প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থার অংশ। আর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পানি চলাচল নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে উপকূলীয় স্লুইস গেইট।
নীতিমালা অনুযায়ী, জোয়ারের সময় স্লুইস গেইট বন্ধ রেখে লবণাক্ত পানি ঠেকানো এবং ভাটার সময় গেইট খুলে উজানের বন্যার পানি দ্রুত বের করে দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে বহু এলাকায় এর উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।
পেকুয়া উপজেলার রাজাখালী, মগনামা, টইটং, শিলখালী ও উজানটিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বন্যার পানি কিছুটা কমলেও অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল এখনো পানির নিচে। অনেক বাড়ির আঙিনায় হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে আছে। কোথাও কোথাও ঘরের ভেতর থেকেও পুরোপুরি পানি নামেনি। গ্রামের সড়কগুলো কাদায় পিচ্ছিল হয়ে পড়েছে, ভেঙে গেছে অনেক কাঁচা রাস্তা। ফলে মানুষকে নৌকা কিংবা হাঁটুসমান পানি পেরিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক দিন ধরে বৃষ্টি কমেছে, নদীর পানিও কিছুটা নেমেছে। তবুও পানি স্বাভাবিক গতিতে নামছে না। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন খালের মুখে মাছের ঘেরের জন্য বাঁধ নির্মাণ এবং কিছু স্লুইস গেইট বন্ধ থাকায় পানি আটকে রয়েছে। ভাটার সময়ও পানি দ্রুত সাগরে যেতে পারছে না। এতে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।
রাজাখালী ইউনিয়নের কৃষক ইদ্রিস আলী বলেন, বৃষ্টি তো কমেছে, কিন্তু পানি নামার কোনো লক্ষণ নেই। ধানের জমি, সবজিখেত সব পানির নিচে। আর কয়েক দিন এভাবে থাকলে যা ছিল তাও শেষ হয়ে যাবে।
মগনামা ও টইটং এলাকায় দেখা গেছে, শত শত মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও বাঁধ ভেঙে মাছ বেরিয়ে গেছে, আবার কোথাও পানি আটকে রাখতে ঘেরের মালিকেরা অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে রেখেছেন বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। এতে আশপাশের বসতবাড়িতে পানি আরও দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকছে।
পেকুয়া উপজেলা সদরের বাজার এলাকায় পানি কমলেও গ্রামীণ জনপদের দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় মানুষকে দূর থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। পাশাপাশি পানিবাহিত রোগের আশঙ্কাও বাড়ছে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু বন্যার পানি সরে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকলে হবে না। পানি নিষ্কাশনের সব প্রতিবন্ধকতা দ্রুত অপসারণ, খালগুলো দখলমুক্ত করা এবং স্লুইস গেইট নিয়ম অনুযায়ী পরিচালনা নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) তানজীর সাইফ আহমেদ বলেন, মানুষের তৈরি প্রতিবন্ধকতার কারণেই এবার পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়েছে।
তিনি জানান, পাউবোর কর্মীরা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে স্লুইস গেইট খুলে দিলেও পরে আবার সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
তার ভাষ্য, কিছু এলাকায় প্রভাবশালী স্থানীয় গোষ্ঠী কাঠের গুঁড়ি ও তক্তা দিয়ে স্লুইস গেইট আটকে রাখছে, যাতে মাছের ঘের ও লবণক্ষেতে পানি ধরে রাখা যায়। ফলে বন্যার পানি দ্রুত বের হতে পারছে না।
তিনি আরও বলেন, শুধু স্লুইস গেইট নয়, মাছ চাষের জন্য অনেক খালের ওপরও অবৈধ বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব বাঁধের কারণে বৃষ্টির পানি স্লুইস গেইট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। গত কয়েক দিনে প্রশাসনের সহযোগিতায় এমন অনেক অবৈধ বাঁধ অপসারণ করা হয়েছে।
কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য লুতফুর রহমান কাজল বলেন, কেউ যদি পানি বের হওয়ার স্লুইস গেইট ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ রাখে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে। জলাবদ্ধতা নিরসনে সব স্লুইস গেইট সচল রাখা জরুরি।
স্থানীয়দের মতে, এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। গত দুই দশকে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েছে। খাল দখল ও ভরাট, অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ, মাছের ঘেরের জন্য খালের ওপর বাঁধ, অপরিকল্পিত বসতি, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অল্প সময়ে অতিবৃষ্টির ঘটনা মিলিয়ে পুরো উপকূলীয় অঞ্চল এখন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তাদের দাবি, বন্যার পর শুধু ত্রাণ বিতরণ বা ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। স্লুইস গেইট কারা বন্ধ রাখছে, কারা খালের ওপর অবৈধ বাঁধ নির্মাণ করছে এবং কোন প্রভাবশালীদের স্বার্থে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় প্রতি বর্ষায় একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হবে, আর দুর্ভোগে পড়বে লাখো মানুষ।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর