হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে আবারও সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। টানা তৃতীয় রাতের মতো ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানোর দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে ইরানও হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন ও মিত্র স্বার্থে পাল্টা হামলার কথা জানিয়েছে। কৌশলগত এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সোমবার (১৩ জুলাই) স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে নতুন দফার হামলা শুরু হয়। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বেসামরিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইরানের হামলা চালানোর সক্ষমতা দুর্বল করতেই এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের বন্দর আব্বাস, কিশ ও কেশম দ্বীপ এবং বুশেহর প্রদেশের জাম এলাকায় রাতজুড়ে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। বন্দর আব্বাসে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলেও এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থা দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালিতে নিয়ম লঙ্ঘনকারী কয়েকটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে দেশটির বাহিনী। একই সঙ্গে বন্দর আব্বাসের কাছে একটি মার্কিন নির্মিত ড্রোন ভূপাতিত করারও দাবি করা হয়েছে।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) জানিয়েছে, ওমানের জলসীমায় হরমুজ প্রণালিতে তাদের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে ইরানি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এতে একজন ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আরও আটজন আহত হয়েছেন।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে বৃহত্তর প্রতিশোধমূলক অভিযান শুরু হয়েছে। এছাড়া ইরানের সেনাবাহিনী কুয়েতে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, জ্বালানি সংরক্ষণাগার, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, গোলাবারুদ গুদাম ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়। এর আগে একই দিনে বাহরাইন, জর্ডান ও কুয়েতেও হামলা চালানোর দাবি করে তেহরান।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ১০ জুলাই কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানান, ৭ জুলাই থেকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পুনরায় শুরু হয়েছে। ফলে কংগ্রেসের নতুন অনুমোদন ছাড়াই আরও ৬০ দিন সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন তিনি।
তবে এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন সিনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার। তিনি বলেন, প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয়ই যুদ্ধ বন্ধ করে মার্কিন সেনাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার পক্ষে ভোট দিয়েছে। তাই ট্রাম্পের উচিত সেই সিদ্ধান্ত মেনে চলা।
এদিকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ সামুদ্রিক তথ্যকেন্দ্র (JMIC) জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাত ৮টা (জিএমটি) থেকে ইরানের সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ কার্যকর হবে। তবে ইরান ছাড়া অন্য গন্তব্যের জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে পারবে। মানবিক সহায়তা বহনকারী জাহাজও তল্লাশির পর চলাচলের অনুমতি পাবে। তবে অবরোধ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট জাহাজে অভিযান চালানো বা প্রয়োজন হলে ধ্বংস করা হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে বাকযুদ্ধ চলছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, প্রণালিটি উন্মুক্ত রয়েছে এবং মার্কিন সুরক্ষার বিনিময়ে সেখানে চলাচলকারী পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ টোল আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, "হরমুজ প্রণালির প্রকৃত রক্ষক সবসময়ই ইরান ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।"
সংঘাত বাড়লেও আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। তার ভাষায়, "যুদ্ধ চলছে, তবে একটি সমঝোতা এখনও সম্ভব।"
নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব পড়েছে। সোমবার ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৯ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮১ ডলারে পৌঁছেছে, যা জুনের মাঝামাঝি সময়ের পর সর্বোচ্চ। এছাড়া জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ক্লেপারের তথ্য অনুযায়ী, ১০ থেকে ১২ জুলাইয়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আগের সপ্তাহের তুলনায় প্রায় ৫২ শতাংশ কমে গেছে। অনেক জাহাজ বিকল্প রুট ব্যবহার করছে বা নিরাপত্তার কারণে তাদের স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (AIS) বন্ধ করে চলাচল করছে।
সূত্র: আল জাজিরা।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর