দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় লজিস্টিকস ও ই-কমার্স ডেলিভারি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘স্টেডফাস্ট কুরিয়ার’-এর অভ্যন্তরীণ কমপ্লায়েন্স, করপোরেট অ্যাকাউন্টেবিলিটি এবং কাজের পরিবেশ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি এক পিকআপ চালককে মারধরের অভিযোগে থানায় দায়ের করা এফআইআর (FIR) বা পুলিশ কেসের বর্তমান অবস্থা, অভিযুক্তদের শাস্তির পরিধি এবং ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণের বিষয়গুলো নিয়ে এখনো এক ধরনের ধোঁয়াশা বজায় রয়েছে।
একই সঙ্গে, এই ধরনের আইনশৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাজনিত সংকটের পর ই-কমার্স মার্চেন্টদের মধ্যেও কোম্পানিটির সঙ্গে কাজ করা নিয়ে স্বস্তি ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
রংপুর অঞ্চলের আধিপত্য ও ‘অদৃশ্য মাফিয়াতন্ত্রের’ অভিযোগ: অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও কর্মী নিয়োগ নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। জানা গেছে, স্টেডফাস্ট কুরিয়ারের বেশিরভাগ কর্মী ও মাঠপর্যায়ের চালক-ডেলিভারিম্যান সুনির্দিষ্টভাবে একটি বিশেষ অঞ্চল-রংপুর বিভাগ থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক কমপ্লায়েন্সের তোয়াক্কা না করে একক অঞ্চলের কর্মীদের এই বিপুল আধিপত্যের কারণে কার্যালয় ও অপারেশনাল হাবগুলোতে এক ধরনের ‘অদৃশ্য মাফিয়াতন্ত্র’ গড়ে উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই আঞ্চলিক মাফিয়াতন্ত্রের সিন্ডিকেটের কারণেই বাইরের অঞ্চলের সাধারণ কর্মীরা প্রায়ই বৈষম্য ও হেনস্থার শিকার হচ্ছেন, যা প্রতিষ্ঠানটির করপোরেট পরিবেশকে কলুষিত করছে এবং মাঠপর্যায়ের বিশৃঙ্খলাকে উসকে দিচ্ছে।
আঞ্চলিক এই মাফিয়াতন্ত্র ও আইন অমান্য করার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সম্প্রতি এক সহিংস সংঘাতের মাধ্যমে। অভিযোগ উঠেছে, স্টেডফাস্ট কুরিয়ারের উগ্র কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দলবদ্ধভাবে সরাসরি দায়িত্বরত পুলিশের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছেন। এই অতর্কিত হামলায় কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুহুল কুদ্দুসসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। আহত পুলিশ সদস্যরা বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক সিন্ডিকেটের অদৃশ্য মাফিয়াতন্ত্র এখন সাধারণ নাগরিক বা মাঠপর্যায়ের চালকদের গণ্ডি পেরিয়ে খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর চড়াও হতেও দ্বিধাবোধ করছে না।
সূত্রে জানা গেছে, পিকআপ চালককে মারধরের ঘটনায় দায়ের করা মামলাটির তদন্ত এখনও দাপ্তরিকভাবে চলমান রয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত চার্জশিট বা প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়নি। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া বর্তমানে এক প্রকার স্থবির হয়ে পড়েছে। পর্দার আড়ালে চালক ইউনিয়ন এবং কোম্পানির প্রভাবশালী মহলের মধ্যে কোনো ধরনের আপস-মীমাংসা বা সমঝোতার চেষ্টা চলছে কি না, তা নিয়ে গুঞ্জন রয়েছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া নির্ধারিত নিয়মেই চলছে।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে মারধরের ঘটনায় সরাসরি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা নেওয়া নিয়ে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, চালক পেটানোর ঘটনায় তীব্র জনরোষ তৈরি হলেও অভিযুক্ত কর্মকর্তারা এখনো স্টেডফাস্টে বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন। তাদের বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্ত বা কোনো কঠোর বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
শ্রম আইন ও করপোরেট কমপ্লায়েন্স (Corporate Compliance) বিশেষজ্ঞদের মতে, ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা না নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের ‘Workplace Safety’ বা কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নীতির চরম লঙ্ঘন। এটি কোম্পানির সামগ্রিক অ্যাকাউন্টেবিলিটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আহত পিকআপ চালক শেষ পর্যন্ত কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা চিকিৎসার খরচ পেয়েছেন কি না, তা নিয়ে স্টেডফাস্টের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে চালক ইউনিয়নের একটি সূত্র দাবি করেছে, ঘটনার পর উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে চালক সমিতির নেতাদের সঙ্গে কোম্পানি একটি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা বৈঠক করেছিল। সেখানে আহত চালকের চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা দেওয়ার কথা বলা হলেও দীর্ঘমেয়াদী কোনো সাপোর্ট বা স্থায়ী ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি। এই নিয়ে চালক ও সাধারণ পরিবহন কর্মীদের মধ্যে এখনো চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার মধ্যেই গত এপ্রিল মাসে স্টেডফাস্ট কুরিয়ারের সার্ভারে বড় ধরনের সাইবার হামলার খবর পাওয়া গেছে। হ্যাকারদের একটি দল দাবি করেছে, তারা প্রতিষ্ঠানটির বিশাল কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ হ্যাক করেছে। ওয়ান ক্লিক বা এক ক্লিকের মাধ্যমে ফাঁস হওয়া এই তথ্যের মধ্যে ই-কমার্স উদ্যোক্তা ও মার্চেন্টদের সংবেদনশীল ব্যবসায়িক তথ্য, ডেলিভারি হিস্টোরি এবং কাস্টমারদের নাম-ঠিকানা রয়েছে বলে জানা গেছে। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, হ্যাক করা এই বিশাল ডেটাবেজটি বর্তমানে ডার্ক ওয়েবে মাত্র ২ হাজার মার্কিন ডলারে (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা) বিক্রির জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এই সাইবার নিরাপত্তা ভাঙার (Data Breach) ঘটনাটি কোম্পানির প্রযুক্তিগত দুর্বলতা ও কমপ্লায়েন্সের অভাবকে নগ্নভাবে প্রকাশ করেছে।
মাঠপর্যায়ের সহিংসতা, পুলিশের ওপর হামলা এবং ডার্ক ওয়েবে গ্রাহকের তথ্য ফাঁসের এই বহুমাত্রিক সংকট সরাসরি প্রভাব ফেলেছে স্টেডফাস্টের মূল চালিকাশক্তি ই-কমার্স মার্চেন্টদের (ব্যবসায়ী) ওপর। ঢাকার কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় অনলাইন উদ্যোক্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “একটি ডেলিভারি কোম্পানির মূল শক্তি হলো তাদের লজিস্টিকস চেইন, আইনানুগ আচরণ ও ডেটা নিরাপত্তা। সেখানে যদি মাঠপর্যায়ে ওসির ওপর হামলা হয় এবং কোটি টাকার পণ্যের কাস্টমার ডেটা ডার্ক ওয়েবে বিক্রি হয়ে যায়, তবে আমাদের ব্যবসা বড় ঝুঁকির মুখে পড়ে।”
মার্চেন্টদের একাংশ আরও জানান, অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনার কারণে তারা এখন এই কুরিয়ারের মাধ্যমে পার্সেল ও তথ্য আদান-প্রদান করতে আর পুরোপুরি স্বস্তি বোধ করছেন না। অনেকেই অল্টারনেটিভ বা বিকল্প কুরিয়ার সার্ভিসের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছেন।
একটি ই-কমার্স লজিস্টিকস কোম্পানির সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাজের সঠিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, আঞ্চলিক প্রভাবমুক্ত নিরপেক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি, রাষ্ট্রীয় আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং মার্চেন্টদের ডেটা ও পণ্যের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়া। চালক পেটানোর মামলার বর্তমান স্থবিরতা, ওসির ওপর হামলা, অভ্যন্তরীণ আঞ্চলিক সিন্ডিকেট এবং ডেটা ফাঁসের এই ঘটনা স্পষ্ট ইঙ্গিত করছে যে, স্টেডফাস্ট কুরিয়ারকে যদি বাজারে টিকে থাকতে হয়, তবে অবিলম্বে তাদের করপোরেট গভর্ন্যান্স ও ইনফরমেশন সিকিউরিটি সিস্টেম সংস্কার করতে হবে। অন্যথায়, আস্থার এই চরম সংকট কোম্পানিটিকে বড় ধরনের ব্যবসায়িক পতনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর