দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সাম্প্রতিক টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং পাহাড়ধসের প্রভাব পুরোপুরি কাটতে না কাটতেই নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে উত্তরাঞ্চলে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে উজানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। এর ফলে অন্তত সাতটি জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যদিও গত তিন দিনে দেশের বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকায় পানি কিছুটা নেমেছে এবং পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, তবে নতুন এই পূর্বাভাস স্থানীয় প্রশাসন ও নদীতীরবর্তী মানুষের মধ্যে সতর্কতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানিয়েছেন, ১৯ থেকে ২৩ জুলাই সময়ের মধ্যে ভারতের উজান এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত হলে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে।
এর প্রভাবে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। একই সময়ে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর পানিও বৃদ্ধি পেয়ে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর ও বগুড়ার কিছু এলাকায় সতর্কসীমা স্পর্শ করতে পারে। ফলে নদীসংলগ্ন নিচু এলাকা সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী তিন দিনের মধ্যে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদ-নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। কোথাও কোথাও এসব নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তাই নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদি বন্যা হলেও এর প্রভাব কৃষি, যোগাযোগ এবং স্থানীয় জনজীবনে উল্লেখযোগ্য হতে পারে। বিশেষ করে চরাঞ্চল ও নিচু এলাকার মানুষকে বেশি সতর্ক থাকতে হবে।
উত্তরাঞ্চলে নতুন করে বন্যার শঙ্কা তৈরি হলেও সিলেট ও সুনামগঞ্জে পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক। পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২৪ ঘণ্টায় সুরমা ও কুশিয়ারা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি মোটামুটি স্থিতিশীল থাকতে পারে। তবে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশের অধিকাংশ বড় নদীর উৎস দেশের বাইরে। তাই উজানে ভারী বৃষ্টি হলে কয়েক দিনের মধ্যেই এর প্রভাব দেশের নদ-নদীতে পড়ে। এর সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে টানা বর্ষণ যুক্ত হলে নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের ঘটনা বেড়েছে। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার প্রবণতা আগের তুলনায় অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে।
দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, আগাম পূর্বাভাস পাওয়া গেলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। তাই নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ, প্রয়োজনীয় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির মজুত রাখা, গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া কৃষকদের ক্ষেতের পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা এবং মাছচাষিদের পুকুরের বাঁধ শক্ত করারও পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
উত্তরাঞ্চলে নতুন করে বন্যার শঙ্কা তৈরি হলেও সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ইতোমধ্যে বড় ধরনের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পর্যটননগরী কক্সবাজার। সেখানে পাহাড়ধস ও ঢলের পানিতে ভেসে ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ২৫ জন আহত এবং একজন নিখোঁজ রয়েছেন।
চট্টগ্রামে আংশিক জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ি ঢলে ১৫ জন নিহত এবং ১২ জন আহত হয়েছেন। বান্দরবানে সাতজন, রাঙামাটিতে তিনজন এবং মৌলভীবাজারে একজন প্রাণ হারিয়েছেন।
দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সাত জেলায় ৮৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে বর্তমানে ৮৪৯ জন আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় চাল, নগদ অর্থ, শুকনা খাবার, শিশুখাদ্য ও গো-খাদ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ৭৫ লাখ টাকা ও ১,২০০ মেট্রিক টন চাল, কক্সবাজারে ৪০ লাখ টাকা ও ৪৫০ মেট্রিক টন চাল এবং রাঙামাটিতে ৩০ লাখ টাকা ও ৫০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বন্যা-পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন সব জেলায় এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। তবে অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী চলবে। বৃহস্পতিবার রাতে এক বিজ্ঞপ্তিতে পরীক্ষা স্থগিতের কথা জানিয়েছে শিক্ষা বোর্ডগুলোর মোর্চা আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি।
যদিও দেশের অনেক এলাকায় বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে, তবে উত্তরাঞ্চলে নতুন করে স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। উজানের বৃষ্টিপাতের ওপর পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে। তাই আগামী কয়েক দিন সংশ্লিষ্ট জেলা ও নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষের জন্য সতর্কতা অবলম্বন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর