স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগ ছুড়ে রেখে টেলিভিশন, মোবাইল কিংবা খেলনায় মগ্ন হয়ে যায় সন্তান। পড়ার কথা বললেই শুরু হয় অনীহা, অজুহাত কিংবা কান্নাকাটি। এই দৃশ্য এখন অনেক পরিবারেরই পরিচিত। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় অনেক অভিভাবক কখনো বকাঝকা করেন, কখনো জোর করে পড়ার টেবিলে বসিয়ে দেন। কিন্তু শিশু মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উল্টো ফলই হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুকে শুধু পড়তে বাধ্য করলেই সে ভালো শিক্ষার্থী হয়ে উঠবে না। বরং শেখার আনন্দ, কৌতূহল এবং আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে পারলেই পড়াশোনা তার কাছে স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হবে।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (UNESCO) এবং ইউনিসেফের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুদের শেখার ক্ষেত্রে মানসিক সুস্থতা, পারিবারিক পরিবেশ এবং ইতিবাচক উৎসাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম তাদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা, ঘুম এবং শেখার আগ্রহের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের শিশু বিশেষজ্ঞদের সংগঠন American Academy of Pediatrics-ও বয়সভিত্তিক স্ক্রিন ব্যবহারে সীমা নির্ধারণের পরামর্শ দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং বই পড়ার অভ্যাস শিশুর জ্ঞানীয় বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
কেন পড়তে বসতে চায় না শিশু?
প্রথমেই বুঝতে হবে, সমস্যাটি সব সময় অলসতা নয়। এর পেছনে থাকতে পারে নানা কারণ— স্কুলে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি, পড়ার বিষয় কঠিন মনে হওয়া, অতিরিক্ত মোবাইল বা ভিডিও দেখার অভ্যাস, পড়ার সময় নিয়ে অতিরিক্ত চাপ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, পরিবারের নেতিবাচক পরিবেশ, প্রশংসার পরিবর্তে সব সময় সমালোচনা।
যদি কারণটি বোঝা যায়, তাহলে সমাধানও সহজ হয়ে যায়।
১. স্কুল থেকে ফিরেই পড়তে বসাবেন না
অনেক অভিভাবক চান সন্তান স্কুল থেকে ফিরেই হোমওয়ার্ক শেষ করুক। কিন্তু শিক্ষাবিদদের মতে, এটি সব সময় কার্যকর নয়।
স্কুল শেষে অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট বিশ্রাম, হালকা নাশতা কিংবা খেলাধুলার সুযোগ দিলে শিশুর মস্তিষ্ক আবার শেখার জন্য প্রস্তুত হয়।
২. নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করুন
প্রতিদিন একই সময়ে পড়তে বসার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এতে শিশুর মস্তিষ্ক একটি নির্দিষ্ট সময়কে শেখার সময় হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে। নিয়মিত কাজগুলো যেমন হতে পারে- বিকেলে নাশতা, এরপর পড়াশোনা, অল্প বিরতি তারপর হোমওয়ার্ক করা ইত্যাদি।
৩. পড়াকে খেলায় পরিণত করুন
শিশুরা খেলতে ভালোবাসে। তাই পড়াকেও আনন্দময় করা যায়। এক্ষেত্র যেসকল পদক্ষেপ নিতে পারেন। তাহলো- ছবি ব্যবহার করুন, গল্পের মাধ্যমে বোঝান, ফ্ল্যাশকার্ড ব্যবহার করুন, ছোট কুইজ নিন, সঠিক উত্তর দিলে ছোট পুরস্কার দিন। এতে করে শেখার প্রক্রিয়াটি চাপ হয়ে উঠবে না, আনন্দময় হয়ে ওঠবে।
৪. ছোট ছোট ভাগে পড়ান
একটানা এক ঘণ্টা পড়ার চেয়ে ২০-২৫ মিনিট মনোযোগ দিয়ে পড়া বেশি কার্যকর।
পড়ার মাঝে পাঁচ মিনিটের বিরতি দিলে শিশুর মনোযোগ দীর্ঘ সময় ধরে রাখা সহজ হয়। একে অনেক শিক্ষাবিদ "ফোকাস-ব্রেক পদ্ধতি" হিসেবেও উল্লেখ করেন।
৫. শুধু নম্বর নয়, চেষ্টারও প্রশংসা করুন
শিশু যদি ভুল করে, সঙ্গে সঙ্গে বকবেন না।
বরং বলুন— "আজ তুমি গতকালের চেয়ে ভালো চেষ্টা করেছ।"
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ফলাফলের চেয়ে প্রচেষ্টার প্রশংসা করলে শিশুর শেখার আগ্রহ দীর্ঘমেয়াদে বেশি থাকে।
৬. মোবাইল ব্যবহারে ভারসাম্য আনুন
মোবাইল পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন নেই।
বরং— পড়ার সময় মোবাইল দূরে রাখুন, নির্দিষ্ট সময় স্ক্রিন ব্যবহারের সুযোগ দিন, শিক্ষামূলক ভিডিও বেছে দিন, পরিবারের সবাই একই নিয়ম মেনে চলুন।
শিশুরা বড়দের অনুকরণ করেই বেশি শেখে। তাই, মোবাইল ব্যবহারে শুধু শিশুকে নিয়ম বেধে দিলেই হবে না, তা পরিবারের অন্য সদস্যদেরও মান্য করতে হবে।
৭. তাকে শেখাতে বলুন
কোনো অধ্যায় শেষ হলে বলুন— "এবার তুমি আমাকে বুঝিয়ে বলো।"
শিশু নিজের ভাষায় বোঝাতে পারলে তার শেখা আরও দৃঢ় হয়। শিক্ষা মনোবিজ্ঞানে এটি একটি কার্যকর শেখার কৌশল হিসেবে বিবেচিত হয়।
৮. শান্ত পরিবেশ তৈরি করুন
পড়ার সময় টেলিভিশনের শব্দ, উচ্চস্বরে কথা বলা কিংবা বারবার বাধা দেওয়া শিশুর মনোযোগ নষ্ট করতে পারে।
পরিচ্ছন্ন, আলো-বাতাসযুক্ত এবং নিরিবিলি একটি পড়ার জায়গা শেখার পরিবেশকে অনেক উন্নত করে।
৯. পর্যাপ্ত ঘুম ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করুন
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের অভাবে শিশুদের মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি এবং শেখার সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
তাই পর্যাপ্ত ঘুম, পর্যাপ্ত পানি পান এবং পুষ্টিকর খাদ্য শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১০. তুলনা নয়, সহযোগিতা করুন
"পাশের বাসার ছেলে তোমার চেয়ে ভালো"—এ ধরনের মন্তব্য শিশুর আত্মবিশ্বাস নষ্ট করতে পারে।
বরং তার আগের ফলাফলের সঙ্গে বর্তমান অগ্রগতির তুলনা করুন। ছোট ছোট উন্নতিকেও গুরুত্ব দিন।
শিশুশিক্ষা বিষয়ে ইতালীয় শিক্ষাবিদ Maria Montessori বলেছিলেন, "শিশু নিজে শেখার স্বাভাবিক ক্ষমতা নিয়েই জন্মায়; আমাদের কাজ হলো সেই শেখার পরিবেশ তৈরি করা।"
অন্যদিকে মনোবিজ্ঞানী Carol Dweck-এর "Growth Mindset" তত্ত্ব বলছে, শিশুকে যদি শেখানো হয় যে পরিশ্রমের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব, তাহলে সে ব্যর্থতাকে ভয় না পেয়ে নতুন কিছু শেখার সাহস পায়।
কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন?
যদি শিশু— দীর্ঘদিন পড়াশোনায় সম্পূর্ণ অনাগ্রহী থাকে, অতিরিক্ত অস্থির বা মনোযোগহীন হয়, স্কুলে ফলাফল হঠাৎ অনেক খারাপ হয়ে যায়, কিংবা আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়। তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞ, কাউন্সেলর বা শিশু মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রতিটি শিশুই আলাদা। কেউ দ্রুত শেখে, কেউ একটু সময় নেয়। তাই সন্তানের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে তাকে বোঝার চেষ্টা করুন। ভালো ফলাফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো শেখার প্রতি ভালোবাসা, কৌতূহল এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা। কারণ যে শিশু শেখাকে উপভোগ করতে শেখে, সে শুধু পরীক্ষায় নয়—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাওয়ার শক্তি অর্জন করে।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর