শিশুর ওজন একটু বাড়লেই বাবা-মায়ের প্রথম চিন্তা— কী খাচ্ছে সে? চিপস, চকোলেট, মিষ্টি, কোমল পানীয় কিংবা ভাজাভুজির তালিকা তৈরি করে অনেকেই সমস্যার কারণ খুঁজে নিতে চান।
কিন্তু শিশুর অতিরিক্ত ওজনের কারণ সবসময় শুধু খাবারের তালিকায় থাকে না। প্রতিদিনের জীবনযাপনের কিছু অভ্যাসও ধীরে ধীরে ওজনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি দেখতে নিরীহ মনে হওয়া কিছু অভ্যাসও দীর্ঘদিন চলতে থাকলে শিশুর স্থূলত্বের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাহলে কোন অভ্যাসগুলির দিকে অভিভাবকদের নজর দেওয়া জরুরি?
১. পানীয়ের মধ্যেও থাকতে পারে বাড়তি ক্যালোরি
শিশু নিয়ম মেনে খাবার খাচ্ছে, খাবারের তালিকায় শাকসবজি ও ফলও রয়েছে। তারপরও ওজন বাড়ছে। এর একটি কারণ হতে পারে পানীয়।
প্যাকেটজাত ফলের রস, কোমল পানীয়, মিষ্টি পানীয় কিংবা অতিরিক্ত চিনি দেওয়া ফ্লেভারড মিল্ক— পানীয় হলেও এগুলিতে যথেষ্ট ক্যালোরি থাকতে পারে। কিন্তু পানীয়কে অনেক সময় খাবারের অংশ হিসেবে হিসাব করা হয় না। ফলে শিশু দিনে কতটা অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ করছে, তা অজান্তেই বেড়ে যেতে পারে।
তৃষ্ণা মেটাতে নিয়মিত মিষ্টি পানীয়ের বদলে পানি পান করার অভ্যাস তৈরি করা তাই গুরুত্বপূর্ণ।

২. মোবাইল বা টিভি দেখতে দেখতে খাওয়া
এক হাতে খাবার, অন্য হাতে মোবাইল— শিশুদের মধ্যে এমন দৃশ্য এখন খুব পরিচিত। কখনও কার্টুন চলছে টেলিভিশনে, আর সেই ফাঁকে খাওয়ানো হচ্ছে খাবার। পর্দায় মনোযোগ আটকে থাকলে শিশু কখন পেট ভরে যাচ্ছে, কখন আর খাওয়ার প্রয়োজন নেই— শরীরের এই স্বাভাবিক সংকেতগুলির দিকে কম মনোযোগ দিতে পারে। পাশাপাশি পর্দায় খাবারের বিজ্ঞাপন দেখেও অপ্রয়োজনীয় খাবারের প্রতি আগ্রহ তৈরি হতে পারে। মাঝেমধ্যে পরিবারের সঙ্গে সিনেমা দেখতে দেখতে কিছু খাওয়া আর প্রতিদিন প্রতিটি খাবার স্ক্রিনের সামনে বসে খাওয়া এক নয়। সমস্যা তৈরি হয় যখন স্ক্রিন-নির্ভর খাওয়াই নিয়মে পরিণত হয়।
তাই সম্ভব হলে খাবারের সময়টুকু স্ক্রিনমুক্ত রাখা ভালো।

৩. খেলাধুলার বদলে সারাদিন বসে থাকা
শিশুকে সক্রিয় রাখতে সবসময় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি করানোর প্রয়োজন নেই। দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট কাজও শারীরিক সক্রিয়তা বাড়াতে পারে। কাছের জায়গায় হেঁটে যাওয়া, সিঁড়ি ব্যবহার করা, সাইকেল চালানো, বাইরে খেলাধুলা করা কিংবা বাড়ির ছোটখাটো কাজে অংশ নেওয়া— সবই শিশুর দৈনন্দিন চলাফেরার অংশ হতে পারে।
কিন্তু হাঁটার দূরত্বও যদি প্রতিবার গাড়িতে যাওয়া হয়, বাইরে খেলার সময় কমে যায় কিংবা সেই সময়টুকুও মোবাইল, ট্যাব বা টেলিভিশনের সামনে কেটে যায়, তাহলে সারাদিনের শারীরিক সক্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
শিশুর ওজনের পাশাপাশি তার সামগ্রিক শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্যও নিয়মিত নড়াচড়া জরুরি।

৪. ঘুমের সময়ের অনিয়ম
শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা হলে খাবার ও পড়াশোনার কথা যতটা গুরুত্ব পায়, ঘুমের কথা অনেক সময় ততটা পায় না। অথচ সুস্থ জীবনযাপনের জন্য পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাত জেগে পড়াশোনা, দীর্ঘ সময় গেম খেলা, মোবাইল বা সমাজমাধ্যম ব্যবহার কিংবা ছুটির দিনে ঘুমের সময় পুরোপুরি বদলে ফেলা— এসব কারণে শিশুর ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ক্ষুধা, দৈনন্দিন সক্রিয়তা ও জীবনযাপনের বিভিন্ন দিক প্রভাবিত হতে পারে। ঘুমের অনিয়ম দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত ওজনের ঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।
তাই শিশুর জন্য নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস তৈরি করাও জরুরি।
শিশুর ওজন বাড়লে শুধু খাবার কমিয়ে দেওয়াই সমাধান নয়। বরং তার খাদ্যাভ্যাস, পানীয় গ্রহণ, ঘুম, শারীরিক সক্রিয়তা এবং স্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাস— সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিশুর শরীর বা ওজন নিয়ে তাকে লজ্জা দেওয়া কিংবা বার বার নেতিবাচক মন্তব্য করাও ঠিক নয়। পরিবারের সবাই মিলে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস তৈরি করলে শিশুর জন্য সেটি অনুসরণ করা অনেক সহজ হয়।
কারণ সুস্থ শৈশব শুধু প্লেটের খাবার দিয়ে তৈরি হয় না। ঘুম, খেলাধুলা, চলাফেরা এবং প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসও শিশুর সুস্থ বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
লাইফ স্টাইল এর সর্বশেষ খবর