জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রাজপথে যে কয়েকটি মুখ বারবার দেখা গেছে, তাঁদের একজন রুমি। কখনো আন্দোলনকারীদের সংগঠিত করছেন, কখনো আহতদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, কখনো পুলিশের ব্যারিকেডের সামনে অবস্থান নিচ্ছেন। ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে তাঁর উপস্থিতি ছিল ধারাবাহিক। তবে এই পথচলার শুরু ২০২৪ সালে নয়। দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা, কারাবরণ, হামলা ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা নিয়েই তিনি পৌঁছেছেন জুলাইয়ের রাজপথে। বর্তমানে তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক।
জুনে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হলে রুমি প্রথম থেকেই আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেন। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকায় এবং গ্রেপ্তারের ঝুঁকির কারণে প্রথম কয়েক দিন প্রকাশ্যে অংশ নেননি। তবে আন্দোলনে সক্রিয় থাকতে সহযোদ্ধাদের উৎসাহিত করেন। ৭, ৮ ও ৯ জুলাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্টে অনুষ্ঠিত ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচিতে সহযোদ্ধাদের নিয়ে যোগ দেন। দীর্ঘ সময় রাজপথে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের জন্য পানি ও স্যালাইনের ব্যবস্থাও করেন।
১১ জুলাই আন্দোলনের মোড় ঘুরতে শুরু করে। শাহবাগ অবরোধ কর্মসূচিতে যাওয়ার পথে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করে তিনি সহযোদ্ধাদের নিয়ে শাহবাগের দিকে অগ্রসর হন। পুলিশের একাধিক ব্যারিকেড অতিক্রম করে আন্দোলনকারীদের শাহবাগে পৌঁছে দেওয়ার সেই ঘটনা আন্দোলনকারীদের মধ্যে নতুন সাহস ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। সেদিনের মিছিলে তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত সরকারবিরোধী স্লোগান আন্দোলনের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতারও ইঙ্গিত বহন করছিল।
১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাসেবায় সহযোগিতা করেন তিনি। পরদিন ১৬ জুলাই পল্টনে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ফিরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিক্ষোভে যোগ দেন। ওই দিনের সংঘর্ষে চারজন শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হন। সংঘর্ষে রুমিও আহত হন।
১৯ জুলাই কারফিউ জারি ও সেনা মোতায়েনের পরও রাজপথ ছাড়েননি তিনি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে কারফিউ অমান্য করে আন্দোলনে অংশ নেন। পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলা, টিয়ারশেল ও গুলির মধ্যেও আন্দোলন চলতে থাকে রাত পর্যন্ত। চোখের সামনে একের পর এক প্রাণহানি দেখেও পিছু হটেননি। বরং আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে আহ্বান জানান, সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে সামনে এগিয়ে আসতে হবে।
১৯ জুলাই রাত থেকে দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখেন। একই সময়ে দেশব্যাপী শুরু হওয়া যৌথ অভিযানে তাঁকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে একাধিকবার তাঁর বাসায় অভিযান চালানো হয়। আত্মগোপনে থাকায় তিনি গ্রেপ্তার এড়িয়ে যান।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় ঘোষণার পরও আন্দোলন থামাননি। ৩ আগস্ট শহীদ মিনারের এক দফা কর্মসূচি, ৪ আগস্ট অবস্থান কর্মসূচি এবং ৫ আগস্ট গণভবনমুখী কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ৫ আগস্ট সকালে কেরানীগঞ্জ থেকে নাজিরাবাজারে পৌঁছে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে ঢাকা মেডিকেল ও শহীদ মিনার এলাকায় যান। পরে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে শাহবাগমুখী বিজয় মিছিলে অংশ নিয়ে পুনরায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফিরে আসেন।
রুমির রাজনৈতিক জীবন ছিল দীর্ঘ সংঘাতের। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে তিনি ১৫টিরও বেশি মামলার আসামি হন, ছয়বার কারাবরণ করেন এবং অসংখ্যবার ছাত্রলীগ ও পুলিশের হামলার শিকার হন। কিন্তু এসব বাধা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বদলাতে পারেনি।
রুমির বিশ্বাস, জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক বিস্ফোরণ ছিল না; বরং দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন, জেল-জুলুম, মামলা, নির্যাতন, আত্মত্যাগ এবং অসংখ্য মানুষের প্রতিরোধের ধারাবাহিক পরিণতি। তাঁর কাছে জুলাই শুধু একটি মাসের নাম নয়—এটি একটি প্রজন্মের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
আজও সেই আন্দোলনের স্মৃতি বহন করে চলেছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশে যেন আর কখনো দুঃশাসন, ভোটাধিকার হরণ বা স্বৈরশাসনের পুনরাবৃত্তি না ঘটে—সেই প্রত্যাশাই আগামী দিনের লড়াইয়ের প্রধান শক্তি।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
ক্যাম্পাস এর সর্বশেষ খবর