সমাজ পরিবর্তনের জন্য সবসময় বড় পদ কিংবা বিপুল সম্পদের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। সেই ভালোবাসাকে শক্তি করে সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে মানবসেবাকে জীবনের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন তরুণ স্বেচ্ছাসেবক মো. আরবাজ হোসেন রুমান। মানবিক নানা উদ্যোগের মাধ্যমে ইতোমধ্যে তিনি আশুলিয়া, সাভার, ধামরাইসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিচিত একটি নাম হয়ে উঠেছেন।
ছাত্রজীবন থেকেই রুমান বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। রক্তদান কর্মসূচি, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সমাজসচেতনতামূলক কার্যক্রম, শীতবস্ত্র বিতরণ, বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও খাদ্য সহায়তা, দুঃস্থ রোগীদের চিকিৎসার জন্য অর্থ সংগ্রহ, মসজিদ-মাদরাসার উন্নয়নে সহায়তা এসব কাজ তিনি নিয়মিত করে আসছেন।
জাতীয় দুর্যোগের সময়ও তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। বিভিন্ন সময়ে কুড়িগ্রাম, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালী, ফেনী, সিরাজগঞ্জ ও গাইবান্ধার বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ছুটে গেছেন। শীতপ্রবণ মানিকগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জের দুর্গম চরাঞ্চলে শীতবস্ত্র বিতরণ এবং নদীভাঙনকবলিত মানুষের মাঝে ঈদ উপহার পৌঁছে দিয়েছেন। আশুলিয়া, সাভার ও ধামরাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় পথশিশু, এতিমখানা, মাদরাসা এবং অসহায় মানুষের জন্য তাঁর মানবিক কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালিত হয়েছে।
তবে তাঁর মানবসেবার সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি রচিত হয় করোনা মহামারির সময়। যখন সংক্রমণের ভয়ে অধিকাংশ মানুষ ঘরবন্দি, তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি কাঁধে অক্সিজেন সিলিন্ডার বহন করে আশুলিয়া ও সাভারের বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে করোনা ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীদের অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়েছেন। সংকটময় সেই সময়ে তাঁর এই উদ্যোগ অনেক মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বর্তমানে তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও যুব সংগঠনের দায়িত্বশীল পদে থেকে তরুণদের মানবিক কাজে উদ্বুদ্ধ করছেন। নেতৃত্ব, সংগঠন পরিচালনা এবং সমাজকল্যাণমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিনি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে প্রশংসা অর্জন করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম গণমাধ্যমেও গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে।
মৃত আফজাল হোসেন ও রাজিয়া বেগম দম্পতির সর্বকনিষ্ঠ সন্তান আরবাজ হোসেন রুমানের জন্ম মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলায়। তবে তাঁর বেড়ে ওঠা আশুলিয়ার পলাশবাড়ী এলাকায়। ধামরাই সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করার পর বর্তমানে তিনি রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে অধ্যয়ন করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থাতেও তিনি নিয়মিত মানবসেবামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
রুমানের বিশ্বাস, একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মানবিকতা। মানুষের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার মধ্যেই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত। ভবিষ্যতেও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে থেকে মানবকল্যাণে কাজ করে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।
রুমানকে নিয়ে তাঁর শিক্ষক ধামরাই সরকারি কলেজের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. সামসুল বারী বলেন, আরবাজ হোসেন রুমান একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই আমার প্রিয় ছাত্র। কলেজে ভর্তি হওয়ার প্রথম দিন থেকেই তাকে বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে দেখেছি। কলেজের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে সে সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করত। সাংগঠনিক দক্ষতার পাশাপাশি সে একজন মেধাবী শিক্ষার্থীও। উপস্থাপনা, রক্তদান কর্মসূচি, দুঃস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, কবিতা আবৃত্তি কিংবা নাট্যচর্চা—সব ক্ষেত্রেই তার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। একজন শিক্ষক হিসেবে তাকে নিয়ে আমি গর্বিত। তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।
রুমানের মানবিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আশুলিয়ার পলাশবাড়ী এলাকার বাসিন্দা এবং গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. আমিনুল ইসলাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই রুমানকে একজন নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দেখে আসছি। হাসপাতালে যখনই কোনো মুমূর্ষু রোগীর জন্য জরুরি রক্তের প্রয়োজন হয়েছে, আমি নির্দ্বিধায় তাকে ফোন করেছি। সে দ্রুত বিনামূল্যে রক্তের ব্যবস্থা করেছে। করোনা মহামারির সময়ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রোগীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়েছে। আমার সুপারিশে অনেক অসহায় মানুষও তার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পেয়েছেন। আমরা এলাকাবাসী তাকে নিয়ে গর্বিত এবং তার মানবিক উদ্যোগে সবসময় পাশে থাকার চেষ্টা করি।
সময়ের সঙ্গে দায়িত্ব বেড়েছে, পরিবর্তন এসেছে জীবনেও। কিন্তু থেমে থাকেনি রুমানের মানবসেবার পথচলা। মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর যে স্বপ্ন নিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই স্বপ্ন আজও সমানভাবে লালন করছেন তিনি। তাই অনেকের কাছে তিনি শুধু একজন শিক্ষার্থী নন, বরং একজন মানবিক যোদ্ধা।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর