• ঢাকা
  • ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ৪ সেকেন্ড পূর্বে
শাহীন মাহমুদ রাসেল
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২৩ জুলাই, ২০২৬, ১১:১৩ রাত

কালো পলিথিনের আড়ালে আটজন মানুষের বেঁচে থাকার গল্প

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

মাথার ওপর একখণ্ড কালো পলিথিন। তার নিচে থোকা থোকা দাঁড়িয়ে আছে চারটি কিশোরী মুখ, একজন মা, আর তাদের ছোট্ট ভাই। পেছনে ধসে পড়া মাটির দেয়াল, বৃষ্টির পানিতে ভেজা লালচে মাটির স্তূপ। এই একটা ছবিই যেন বলে দেয় গোটা পরিবারের গল্প। একটি ঘর নয়, একটি অস্তিত্বের লড়াই।

কক্সবাজারের রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম জাউচপাড়ায় এই মাটির ঘরটিই ছিল দিল মোহাম্মদ ও রোকেয়া বেগমের আট সদস্যের পরিবারের একমাত্র আশ্রয়। টানা বৃষ্টিতে সেই আশ্রয়ও এখন প্রায় বিলীন হওয়ার পথে। চালের ফুটো দিয়ে গড়িয়ে পড়ে বৃষ্টি, হাঁড়ি-পাতিলে জমে থাকে আতঙ্ক চালের ওপর টাঙানো পলিথিন বেয়ে টপটপ করে ঘরে পড়ছে বৃষ্টির পানি। সেই পানি ঠেকাতে সংসারের যতগুলো হাঁড়ি-পাতিল আছে, সবই সারি বেঁধে রাখা হয়েছে মেঝেতে। রাতে ঘুমানোর জায়গাও শুকনো থাকে না, বইপত্র রাখতে হয় পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বস্তার ওপর- পড়ার টেবিল তো দূরের কথা।

গৃহকর্তা দিল মোহাম্মদ শারীরিকভাবে প্রায় অচল, বছর কয়েক আগের এক সড়ক দুর্ঘটনায় স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলাও করতে পারেন না তিনি। স্ত্রী রোকেয়া বেগমের এক চোখ নষ্ট, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। এই দুই মানুষের কাঁধেই ছয় মেয়ের সংসারের ভার। দুই মেয়ে পরিবারের অসম্মতিতে গোপনে বিয়ে করলেও এখন তারাও থাকছেন বাবা-মায়ের সঙ্গেই একই ঘরে। ফলে ছয় মেয়ের খাওয়া, পোশাক আর লেখাপড়ার খরচ জোগানো ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠছে তাদের জন্য।

সাম্প্রতিক ভারি বৃষ্টি ও বন্যায় ঘরের মাটির দেয়ালের বড় অংশ ধসে পড়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। বৃষ্টি নামলেই পানি ঢুকে পড়ে ঘরে, আর যেকোনো সময় পুরো ঘরটিই ভেঙে পড়তে পারে বলে আতঙ্কে দিন কাটছে পরিবারটির।

পরিবারের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা পড়ে গর্জনিয়া ইসলামিয়া আলিম মাদরাসায়। বয়সে কিশোরী হলেও তার কণ্ঠে যেন এক পরিবারের সব ক্লান্তি জমাট বেঁধে আছে। ভাঙা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে সে বলে, ‘আমার মা-বাবা দুজনই অচলপ্রায়। আমাদের খাওয়া, পড়াশোনা ও থাকার ঘর ভেঙে গেছে। আমরা এখন অসহায়। আমাদের দেখার কেউ নেই। সবার সহযোগিতা চাই।’

দিল মোহাম্মদের কণ্ঠে ক্লান্তি আর অসহায়ত্ব একসঙ্গে ঝরে পড়ে। তিনি বলেন, ‘আগে দিনমজুরের কাজ করতাম। পরে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর আগের মতো কাজ করতে পারি না। হাঁটাচলাও করতে কষ্ট হয়। ছয় মেয়ে নিয়ে খুব কষ্টে আছি।’

রোকেয়া বেগম মনে করিয়ে দেন, সংসারটা একেবারেই অসহায় ছিল না একসময়। তিনি বলেন, ‘আগে মানুষের ক্ষেত-খামারে কাজ করে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টাকা মজুরি পেতাম। পাশাপাশি হাঁস-মুরগি পালন করেও প্রতি মাসে কিছু আয় হতো। এসব আয়ের টাকা দিয়ে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ ও সংসারের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করতাম। কিন্তু বর্ষা শুরুর পর থেকে সেই কাজকর্মও প্রায় বন্ধ। তার ওপর ঘরের দেয়াল ধসে পড়ায় প্রশ্ন এখন অস্তিত্বের। ছয় মেয়েকে নিয়ে এখন কোথায় থাকব, কিভাবে সংসার চালাব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’

প্রশাসনের আশ্বাস গর্জনিয়া ইউনিয়ন যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতি মো. শহীদুল্লাহ শহীদ পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে পরিবারটির মাটির দেয়ালের ঘর ভেঙে গেছে। বাবা-মা দুজনই প্রায় অচল। তাদের মেয়েরা পড়াশোনা করতে চায়। সরকারের সহযোগিতা ও প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করছি।’

ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন স্থানীয় সমাজকর্মী ইব্রাহীম। তার চোখেও যেন ফুটে ওঠে পরিবারটির নিত্যদিনের কষ্টের ছাপ। তিনি বলেন, ‘পরিবারটি আসলে অনেক অসহায়। মাটির দেয়ালটি যেভাবে ধসে পড়েছে, তাতে যেকোনো মুহূর্তে বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। ছয় মেয়েকে নিয়ে তারা যে মানবেতর জীবনযাপন করছে, তা সহ্য করার মতো নয়। এই পরিবারের পাশে এখনই কাউকে না কাউকে দাঁড়াতে হবে, না হলে যেকোনো সময় বড় কিছু ঘটে যেতে পারে।’

স্থানীয় সমাজকর্মী মুহিবুল্লাহ চৌধুরী জিল্লুর কণ্ঠে ফুটে ওঠে জরুরি ভিত্তিতে সহায়তার তাগিদ। তিনি বলেন, ‘পরিবারটির জন্য দ্রুত একটি বাসযোগ্য ঘর প্রয়োজন। পাশাপাশি মেয়েদের লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়া দরকার।’ এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলের সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।

রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘এক গণমাধ্যম কর্মীর মাধ্যমে পরিবারটির বিষয়ে জানতে পেরেছি। খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। প্রতিবন্ধী ভাতা, বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং মেয়েদের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

স্থানীয়দের মতে, ছবিটার দিকে তাকালে বোঝা যায়, এই পরিবারের গল্প শুধু একটি ভাঙা ঘরের গল্প নয়। এটি সেইসব পরিবারের প্রতিচ্ছবি, যারা প্রতিটি বর্ষায় নতুন করে ভাঙনের মুখোমুখি হয়, অথচ যাদের কণ্ঠ সহজে পৌঁছায় না প্রশাসনের কানে। উম্মে হাবিবার মতো মেয়েরা এখনো স্বপ্ন দেখে বই খুলে বসার- কিন্তু সেই স্বপ্নের ওপর এখন ঝুলছে একখণ্ড ছেঁড়া পলিথিন, যেকোনো মুহূর্তে যা উড়ে যেতে পারে দমকা বাতাসে।

সাজু/নিএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:


BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ [email protected]
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ [email protected]