• ঢাকা
  • ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ২৪ সেকেন্ড পূর্বে
শাহীন মাহমুদ রাসেল
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২৪ জুলাই, ২০২৬, ০২:৪৩ দুপুর

চাঁদা না দিলে লাশ, দিলে দাসত্ব— ডেভিড ইমনের নিয়মে চলছে চট্টগ্রাম

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

সুদর্শন সুঠাম দেহের যুবক। চলাফেরায় আভিজাত্যের ছোঁয়া, যেন হিন্দি ছবির নায়ক। কখনো বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে, কখনো পাঁচতারকা হোটেলের লবিতে হাঁটাহাঁটি করছেন তিনি। হাতে দামি ঘড়ি, ফেসবুক ওয়ালজুড়ে ঝলমলে ছবি আর ভিডিওর সারি, ফলোয়ার লাখ ছাড়িয়ে গেছে বহু আগে। এই মুখটাই এখন চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের সবচেয়ে আলোচিত ও মুর্তিমান আতঙ্কের নাম- মোবারক হোসেন ইমন, যাকে সবাই চেনে ডেভিড ইমন নামে।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের কাছে এখন সবচেয়ে ভয়ের শব্দ দুটি- ‘হোয়াটসঅ্যাপ কল’। অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসে, ওপাশে পরিচয় দেওয়া হয় ডেভিড ইমন নামে, দাবি করা হয় মোটা অঙ্কের চাঁদা, বেঁধে দেওয়া হয় সময়সীমা। আর টাকা না দিলে পরিণতি কী হতে পারে, তা দেখিয়ে দিতে তার বাহিনীর সময় লাগে না।

সপ্তাহখানেক আগে নগরের চন্দনপুরায় একটি ইন্টারনেট সেবাপ্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন। দুই দিনের আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার পরও টাকা না পেয়ে দুপুরে সরাসরি প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৩০-৩৫ জন যুবক দেশীয় অস্ত্র হাতে অফিসে ঢুকে ভাঙচুর চালায়, কর্মীদের মারধর করে এবং নগদ অর্থ ও মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পুরো হামলাটি পরিচালিত হয়েছে ডেভিড ইমনের সরাসরি নির্দেশে। ঘটনার কয়েক ঘণ্টা না পেরোতেই নগরের জিইসি মোড়ে অবস্থিত আরেকটি আইএসপি প্রতিষ্ঠানের মালিকের মোবাইলে আসে আরেকটি হোয়াটসঅ্যাপ কল। ওপাশ থেকে শোনানো হয় একটি বাক্য- ‘ডিডিএনের অবস্থা তো দেখেছেন। টাকা না দিলে আপনারও একই পরিণতি হবে।’ এই একটি বাক্যই এখন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মহলে নতুন আতঙ্কের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক মাসে অন্তত তিনটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ডেভিড ইমন বাহিনীর বিরুদ্ধে। অক্সিজেন, মুরাদপুর, বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ ও জিইসি এলাকার একাধিক ব্যবসায়ীও একই ধরনের হুমকির শিকার হয়েছেন। তাদের অনেকে নিরাপত্তার শঙ্কায় থানায় অভিযোগ পর্যন্ত করার সাহস দেখাননি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাত্র দুই বছর আগেও চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে ‘ডেভিড ইমন’ নামটি প্রায় অচেনাই ছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের গ্রুপে যুক্ত হয়ে দ্রুতই নিজের অবস্থান তৈরি করে নেন তিনি।

তার বাড়ি ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নে। বাবা মো. মুসা পেশায় কৃষক। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, সাধারণ কৃষক পরিবারে বেড়ে ওঠা ইমনের লেখাপড়া বেশি দূর গড়ায়নি। কৈশোরেই জড়িয়ে পড়েন কিশোর গ্যাংয়ে, এরপর স্থানীয় অপরাধচক্র হয়ে প্রবেশ করেন বড় সাজ্জাদের নেটওয়ার্কে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, একের পর এক সহিংস ঘটনায় সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই দ্রুত বড় সাজ্জাদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন ইমন। বর্তমানে তাকে বিবেচনা করা হচ্ছে নগরীর আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে সক্রিয় অপারেশন-পরিচালনাকারীদের একজন হিসেবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বড় সাজ্জাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগীদের একজন এবং গ্রুপের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতৃত্বে রয়েছেন ডেভিড ইমন। পলাতক সাজ্জাদের হয়ে নগরে চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার, সন্ত্রাসী তৎপরতা এবং বাহিনী পরিচালনার দায়িত্বও তার কাঁধেই।

একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বড় সাজ্জাদ দেশের বাইরে অবস্থান করলেও চট্টগ্রামে তার নেটওয়ার্ক সচল রেখেছেন ডেভিড ইমন। তার নেতৃত্বে অর্ধশতাধিক তরুণের একটি সংঘবদ্ধ বাহিনী নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে।

পুলিশের নথি অনুযায়ী, গত দুই বছরে অন্তত সাতটি হত্যা মামলায় নাম এসেছে ডেভিড ইমনের। ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়ায় আলোচিত জোড়া খুন, একই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে ঢাকাইয়া আকবর হত্যা এবং ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট আনিস ও মোহাম্মদ হাসানকে ব্রাশফায়ারে হত্যার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এসব মামলার তদন্ত এখনো চলমান।

তদন্তকারীদের ভাষ্য, এসব হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে নির্মূলের পাশাপাশি অপরাধ জগতে নিজের প্রভাবও ধাপে ধাপে বাড়িয়েছেন ইমন। একসময় সাজ্জাদ গ্রুপের মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বে ছিলেন ‘ছোট সাজ্জাদ’ নামে পরিচিত সাজ্জাদ হোসেন। তিনি কারাগারে যাওয়ার পর গ্রুপের নেতৃত্ব ভাগ হয়ে যায়- নগরী অংশের নেতৃত্বে আসেন ডেভিড ইমন, আর জেলার বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় হন মোহাম্মদ রায়হান আলম।

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা, রাউজান ও হাটহাজারী এলাকায় গ্রুপটির নেটওয়ার্ক এখন যথেষ্ট শক্তিশালী। চাঁদাবাজি, জমি দখল, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, হামলা এবং হত্যাকাণ্ডের মতো একাধিক অপরাধে তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে এসেছে বারবার।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আগের মতো আর সরাসরি লোক পাঠানো হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চাঁদাবাজি শুরু হয় একটিমাত্র হোয়াটসঅ্যাপ কলে। ভার্চ্যুয়াল নম্বর কিংবা বিদেশি নম্বর ব্যবহার করায় কলদাতাকে শনাক্ত করাও হয়ে পড়ে কঠিন।

ভুক্তভোগী এক আইএসপি মালিক বলেন, ‘ফোন ধরলেই বুঝে যাই কী বলতে এসেছে। টাকা না দিলে হামলা হবে, অফিস টিকবে না, পরিবার নিয়েও ভয় থাকে। তাই অনেকে বাধ্য হয়ে টাকা দিয়ে দেন।’

চন্দনপুরার হামলার পর ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) চট্টগ্রাম বিভাগ জরুরি সংবাদ সম্মেলনের ডাক দেয়। সংগঠনের আহ্বায়ক রাজিব শাহরিয়ার বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানে হামলার মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ নয়; দেশের বিভিন্ন স্থানে আইএসপি ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি, টেলিফোনে হুমকি এবং হামলার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে, যা পুরো শিল্পের জন্য গভীর নিরাপত্তা সংকট তৈরি করেছে। তিনি ডেভিড ইমন ও তার সহযোগীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্তে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে, আর জড়িতদের গ্রেপ্তারে মাঠে রয়েছে একাধিক দল।

নগর পুলিশ কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী জানান, বাকলিয়ায় ইন্টারনেট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় ডেভিড ইমনসহ জড়িত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ইতিমধ্যে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে র‍্যাব-৭ ও পুলিশের পৃথক অভিযানে মূল সংগঠক মাইকেল নামে এক যুবকসহ মোট ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে বলে জানান তিনি।

পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছে। মোহাম্মদ রায়হান ও ইমন তার হয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করে আসছেন। ডেভিড ইমন এর আগেও একাধিকবার বিভিন্ন ব্যক্তি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে ফোনে চাঁদা দাবি করেছেন বলে অভিযোগ আছে।

ভুক্তভোগীদের মতে, চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে ডেভিড ইমনের উত্থান শুধু একজন সন্ত্রাসীর ব্যক্তিগত গল্প নয়- এটি সংগঠিত অপরাধের নতুন কৌশল, প্রযুক্তিনির্ভর চাঁদাবাজি এবং ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তাহীনতার এক নতুন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, আজ যদি একটি হোয়াটসঅ্যাপ কলেই কোটি টাকার চাঁদা আদায় হয়ে যায়, তাহলে কাল একই কল আরেকটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসবে। সেই বাস্তবতা ভাঙতে হলে শুধু পুলিশি অভিযানই যথেষ্ট নয়- প্রয়োজন অপরাধচক্রের অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি ভেঙে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ, এমনটাই মত সংশ্লিষ্টদের। ১৭ জন গ্রেপ্তার হলেও যতক্ষণ না মূল হোতা ডেভিড ইমন আইনের আওতায় আসছেন, ততক্ষণ চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের ফোনের রিংটোন একটি আতঙ্কের নামই বয়ে বেড়াবে।###

শাহীন মাহমুদ রাসেল কক্সবাজার-০১৮১৯৯৯১২৯৯

সালাউদ্দিন/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:


BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ [email protected]
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ [email protected]