রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইসেন্স পুনর্বহালের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে সরকার। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের করা ব্যাপক সংস্কার ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাম্প্রতিক পরিদর্শনে সন্তোষজনক অগ্রগতি পাওয়ায় শিগগিরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে হাসপাতালটি পুনরায় চালুর জন্য আবেদন করে আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদফতরের একটি প্রতিনিধি দল হাসপাতালটি পরিদর্শন করে। পরিদর্শন শেষে তারা হাসপাতালের দৃশ্যমান পরিবর্তনে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং কিছু অতিরিক্ত পরামর্শ দেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেসব পরামর্শও ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ত্রুটি সংশোধনের দাবি জানিয়ে পুনরায় পরিদর্শনের আবেদন করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়ন করবেন। পরিদর্শনে সন্তোষজনক অগ্রগতি পাওয়া গেলে সরকার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের উপপরিচালক (হাসপাতাল) ডা. সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী জানান, যেসব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছিল, সেসব বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কাজ করেছে এবং পরে আপিল করেছে। এখন আপিল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পর্যালোচনা করবে। স্বাস্থ্য অধিদফতরও তাদের পরিদর্শন প্রতিবেদন জমা দেবে। তিনি বলেন, হাসপাতালের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উন্নয়ন পরিদর্শনে পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি ইতিবাচকভাবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল বলেন, সরকারি নির্দেশনা পূর্ণাঙ্গভাবে অনুসরণ করে হাসপাতালের সব ওয়ার্ড নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। বেডের বিন্যাস, শিশু ওয়ার্ড, পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ড, সাধারণ ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন বিভাগ আধুনিকায়ন করা হয়েছে। সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে হাসপাতালের মেঝেতে বিশেষ ‘এপক্সি’ কোটিং করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, সরকারি নির্দেশনার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়ে হাসপাতালটিকে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং সর্বশেষ পরিদর্শনে কর্মকর্তারা সার্বিক প্রস্তুতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
গত ২৭ মে হাসপাতালের পোস্ট-ডেলিভারি ওয়ার্ডে অক্সিজেন সংকট ও ব্যবস্থাপনার নানা ত্রুটির মধ্যে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। তদন্তে অক্সিজেনের স্বল্পতা, দীর্ঘ সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি) বন্ধ থাকা, বিকল্প ভেন্টিলেশনের অভাব এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার বিষয় উঠে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদফতর হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করে এবং পরে আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ সরকারের কাছে আপিল করে।
হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের ফলে চিকিৎসাসেবা যেমন ব্যাহত হয়েছে, তেমনি প্রতিষ্ঠানটির মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত ২৯৫ জন বিদেশি শিক্ষার্থীসহ শত শত শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। এ কারণে হাসপাতালটির কার্যক্রম পুনরায় চালুর দাবি জানিয়ে রোগী, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নিয়েছেন। বিষয়টি জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়েছে।
এদিকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের চেয়ারপারসন শিরীন পারভিন বলেন, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান আদ্-দ্বীন হাসপাতাল দীর্ঘদিন ধরে লাখো মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত করে আসছে। তাই প্রয়োজনীয় সংশোধনের পর হাসপাতালটির কার্যক্রম দ্রুত চালুর সুযোগ দেওয়া উচিত।
একই ধরনের মত দিয়েছে বেসরকারি হাসপাতাল মালিকদের সংগঠন বিপিএইচসিডিএ। সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, ছয় নবজাতকের মৃত্যু অত্যন্ত মর্মান্তিক হলেও, তদন্তে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত। একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার কারণে পুরো হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে রাখলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষ, যারা সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবার ওপর নির্ভরশীল।
স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, আপিল শুনানি ও পরিদর্শন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হাসপাতালটির লাইসেন্স পুনর্বহালের বিষয়ে সরকার ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে শিগগিরই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা এর সর্বশেষ খবর