দীর্ঘ ১১ বছর ধরে নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নবম জাতীয় পে স্কেল নিয়ে আবারও আলোচনা তুঙ্গে উঠেছে। গত ১ জুলাই থেকে নতুন পে স্কেল কার্যকর হওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও এখনো সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। ফলে চাকরিজীবীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বাড়ছে।
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি অর্থ বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেল সময়ের দাবি। তবে এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থানই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারের রাজস্ব আয় এখনো প্রত্যাশিত লক্ষ্যে পৌঁছায়নি। পাশাপাশি বাজেট ঘাটতির চাপও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বড় পরিসরে বেতন-ভাতা বাড়ানো হলে সরকারি ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে বাজারে অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে আইএমএফ।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। নবম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর হলে তাদের বেতন-ভাতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতার জন্য প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ এ খাতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা।
এ ছাড়া ‘জনপ্রশাসন-নিট’ খাতে সংশোধিত বাজেটের তুলনায় অতিরিক্ত ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। এই অর্থ সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও পেনশনভোগীদের বেতন-ভাতা বাড়াতে ব্যয় করা হতে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি ব্যয় বাড়লেও রাজস্ব আদায় সে অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে একসঙ্গে পুরো পে স্কেল বাস্তবায়ন করা হলে বাজেট ঘাটতি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এতে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকটের ঝুঁকিও দেখা দিতে পারে।
সরকারি সূত্রগুলোও ইঙ্গিত দিয়েছে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এক ধাপে পুরো পে স্কেল বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে। তাই ধাপে ধাপে বেতন-ভাতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথম ধাপে মূল বেতন বা বেসিক বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা যুক্ত করা হতে পারে।
আইএমএফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকারের রাজস্ব আয় এখনো প্রত্যাশিত লক্ষ্যে পৌঁছায়নি এবং বাজেট ঘাটতির চাপও রয়েছে। এ অবস্থায় বড় পরিসরে বেতন বৃদ্ধি সরকারি ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন প্রয়োজন। তবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কৌশলই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত হতে পারে।
এখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দৃষ্টি সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও নবম জাতীয় পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের দিকে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জাতীয় এর সর্বশেষ খবর