• ঢাকা
  • ঢাকা, বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ২৮ সেকেন্ড পূর্বে
মো. আশিকুজ্জামান
বাকৃবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২৯ জুলাই, ২০২৬, ০৪:৩৪ দুপুর

আলোচিত সবুজ মাংসের ঘটনায় বাকৃবির প্রাণি ও মাংস বিশেষজ্ঞের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

খুলনায় একটি বেকারির কর্মচারীদের পিকনিকে রান্না করা গরুর মাংস অস্বাভাবিকভাবে সবুজ হয়ে যাওয়ার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।

এ ঘটনার পর অনেকেই বিষক্রিয়া বা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো রাসায়নিক মেশানোর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তবে মাংস বিজ্ঞান ও খাদ্য রসায়নের দৃষ্টিকোণ থেকে এ ঘটনার একটি যৌক্তিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) এনিম্যাল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ মিট সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. আবুল হাশেম।

বুধবার (২৯ জুলাই) বিডি২৪লাইভকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেন।

অধ্যাপক ড. আবুল হাশেম বলেন, আমার মতে এ ধরনের রঙ পরিবর্তনের প্রধান কারণ হলো মাংসের ভেতরে থাকা মায়োগ্লোবিন প্রোটিন এবং এর পরফাইরিন বা হিম রিংয়ের রাসায়নিক পরিবর্তন। এ জন্য বাইরে থেকে কোনো রং বা রাসায়নিক মেশানোর প্রয়োজন হয় না।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, মায়োগ্লোবিনের কেন্দ্রে থাকা আয়রনের জারণ অবস্থা এবং এর সঙ্গে যুক্ত লিগ্যান্ডের ধরনের ওপর মাংসের রঙ নির্ভর করে। জবাইয়ের পর পরফাইরিন রিংয়ের ফ্রি বাইন্ডিং সাইটে কোনো মৌল যুক্ত না থাকলে তাকে মায়োগ্লোবিন, ডিঅক্সিমায়োগ্লোবিন বা রিডিউসড মায়োগ্লোবিন বলা হয়।

এ সময় কেন্দ্রে থাকা আয়রন ফেরাস অবস্থায় থাকে এবং মাংস বেগুনি-লাল বর্ণ ধারণ করে। বাতাসের সংস্পর্শে এলে অক্সিমায়োগ্লোবিন তৈরি হয়, ফলে মাংস উজ্জ্বল লাল রঙ ধারণ করে, যা সাধারণত তাজা মাংসের বৈশিষ্ট্য হিসেবে পরিচিত।

তিনি আরও বলেন, উজ্জ্বল লাল অবস্থায় পরফাইরিন রিংয়ের ফ্রি বাইন্ডিং সাইটে অক্সিজেন যুক্ত থাকলেও আয়রন ফেরাস অবস্থায়ই থাকে। এই উজ্জ্বল লাল রঙ সাধারণত দুই থেকে তিন ঘণ্টা স্থায়ী হয়। এরপর ধীরে ধীরে মাংস বাদামি বর্ণ ধারণ করতে শুরু করে। এ পর্যায়ে পরফাইরিন রিংয়ের ফ্রি বাইন্ডিং সাইটে পানি যুক্ত হয় এবং ফেরাস আয়ন ফেরিক আয়নে রূপান্তরিত হয়ে মেটমায়োগ্লোবিন সৃষ্টি করে।

এটি মাংসের একটি স্বাভাবিক রাসায়নিক পরিবর্তন। তবে পচনকারী ব্যাকটেরিয়া হাইড্রোজেন সালফাইড (H₂S) উৎপন্ন করলে সেই সালফার পরফাইরিন রিংয়ের ফ্রি বাইন্ডিং সাইটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সালফোমায়োগ্লোবিন তৈরি করে। এর ফলেই মাংস সবুজ বর্ণ ধারণ করে এবং রান্নার পর সেই সবুজ রঙ আরও স্পষ্ট ও গাঢ় হয়ে ওঠে।

রান্না করা মাংসে সবুজ বর্ণ দেখা দেওয়ার চারটি প্রধান কারণ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথম কারণ হলো সালফোমায়োগ্লোবিনের সৃষ্টি। পচনশীল বা সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা মাংসে Pseudomonas, Shewanella putrefaciens এবং কিছু Lactobacillus প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া সালফারযুক্ত অ্যামিনো অ্যাসিড ভেঙে হাইড্রোজেন সালফাইড (H₂S) উৎপন্ন করে। এই গ্যাস পরফাইরিন রিংয়ের একটি দ্বি-বন্ধনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্থায়ী সবুজাভ রঞ্জক তৈরি করে, যা রান্নার তাপে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয় কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি হলো কোলেগ্লোবিন বা ভার্ডোহিমের গঠন। হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড কিংবা জারিত লিপিডের প্রভাবে এ পরিবর্তন ঘটে। Leuconostoc ও Weissella গোত্রের ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়া পারঅক্সাইড উৎপন্ন করে, যা পরফাইরিন রিংকে জারিত করে সবুজ রঞ্জক সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিন সংরক্ষণের ফলে লিপিড অক্সিডেশন হলেও একই ধরনের পরিবর্তন হতে পারে এবং তখন মাংসে র‍্যান্সিড গন্ধও দেখা দেয়।

তৃতীয় ও চতুর্থ কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ দুটি কারণ মূলত প্রসেসড বা কিউরড মাংসের সঙ্গে সম্পর্কিত। অতিরিক্ত নাইট্রাইট ব্যবহারের ফলে নাইট্রোসিল-জাতীয় সবুজ রঞ্জক তৈরি হতে পারে, যা আন্তর্জাতিকভাবে "নাইট্রাইট বার্ন" নামে পরিচিত। এটি পচনের লক্ষণ নয়; বরং কিউরিং প্রক্রিয়ায় রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতার ফল।

অন্যদিকে, তীব্র জারণের চূড়ান্ত পর্যায়ে পরফাইরিন রিং সম্পূর্ণ ভেঙে বিলিভার্ডিন-সদৃশ বাইল-জাতীয় পিগমেন্ট তৈরি হয়, যার ফলে সবুজ রঙ স্থায়ী হয়ে যেতে পারে।

খুলনার ঘটনাকে কেন্দ্র করে অধ্যাপক ড. আবুল হাশেম মনে করেন, প্রথম ও দ্বিতীয় ব্যাখ্যাই সবচেয়ে সম্ভাব্য। তিনি বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী কসাই আগের দিন গরু জবাই করে সাধারণ রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করেছিলেন এবং পরদিন তা বিক্রি করেন। যথাযথ কোল্ড-চেইন বজায় না থাকলে অথবা দীর্ঘ সময় মাংস জীবাণু বৃদ্ধির উপযোগী পরিবেশে থাকলে রান্নার আগেই ব্যাকটেরিয়াজনিত H₂S উৎপাদন বা লিপিড অক্সিডেশন শুরু হতে পারে। রান্নার সময় জীবাণু ধ্বংস হয়ে গেলেও তাদের সৃষ্টি করা রাসায়নিক পরিবর্তন থেকে যায়। ফলে রান্নার পর সবুজ বর্ণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই রান্না করা মাংসে জীবিত জীবাণু না পাওয়া গেলেও সেটি যে সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিল, এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি আরও বলেন, অনেকেই ধারণা করেছিলেন বেকারিতে ব্যবহৃত কোনো রাসায়নিক বা মসলা মাংসের রঙ পরিবর্তনের জন্য দায়ী। তবে ঘটনায় তরকারির ঝোল স্বাভাবিক লাল রঙের ছিল, পরিবর্তন দেখা গেছে শুধু মাংসের টুকরোগুলোতে। তাঁর মতে, এই পর্যবেক্ষণ বাইরের কোনো রাসায়নিকের চেয়ে মাংসের ভেতরের হিম রঞ্জকের রাসায়নিক পরিবর্তনের ব্যাখ্যাকেই বেশি সমর্থন করে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে নমুনাভিত্তিক পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ অপরিহার্য।

জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি বলেন, সালফোমায়োগ্লোবিন বা কোলেগ্লোবিনজনিত সবুজ বর্ণ সাধারণত জীবাণুজনিত পচনের ইঙ্গিত বহন করে। তাই এ ধরনের মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকাই উচিত। কিউরড মাংসে নাইট্রাইটজনিত সবুজ বর্ণ সব সময় পচনের নির্দেশক না হলেও উৎস নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তা গ্রহণ করা নিরাপদ নয়। সন্দেহজনক রঙের মাংস ফেলে দেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।

তিনি আরও বলেন, রান্না করা মাংসে সবুজ বর্ণের মূল কারণ হলো পরফাইরিন রিংয়ের রাসায়নিক পরিবর্তন, যা ব্যাকটেরিয়াজাত H₂S, পারঅক্সাইড, লিপিড অক্সিডেশন অথবা অতিরিক্ত নাইট্রাইটের প্রভাবে ঘটতে পারে। এ প্রক্রিয়া সাধারণত রান্নার আগেই শুরু হয় এবং রান্না কেবল সেই পরিবর্তনকে দৃশ্যমান করে তোলে।

এ ধরনের ঘটনা এড়াতে জনস্বার্থে তিনি কয়েকটি পরামর্শও দেন। তাঁর মতে, জবাইয়ের পর থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো কোল্ড-চেইন সঠিকভাবে বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত শীতলীকরণ, উপযুক্ত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং মানসম্মত ভ্যাকুয়াম প্যাকেজিং ব্যবহার করলে জীবাণুর বৃদ্ধি ও লিপিড অক্সিডেশন উভয়ই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে কোল্ড-চেইন ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং খুচরা পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিধির ঘাটতি নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। বিদ্যুৎ বিভ্রাট কিংবা পরিবহনের সময় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে বাইরে থেকে মাংস স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে রাসায়নিক পরিবর্তন শুরু হতে পারে, যা রান্নার পর স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়।

সালাউদ্দিন/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:


BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ [email protected]
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ [email protected]