‘পরিচিত মুখ, অপরিচিত প্রেক্ষাপট’ শিরোনামে শিশুশ্রম, শিশু ও অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব এবং শিশুশ্রম নির্মূলের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান অডিটোরিয়ামে চারুকলা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এ এম হাবীব ওসমান সঞ্চালনায় এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনায় অতিথি হিসেবে ছিলেন অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষক অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ, চারুকলা বিভাগের অধ্যাপক এম এম ময়েজউদ্দীন, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থা বিভাগের মেহেদী হাসান দীপু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহিন মোল্লা।
উদ্বোধনীতে চারুকলা বিভাগের অধ্যাপক এম এম ময়েজউদ্দীন বলেন, ‘ফ্যামিলিয়ার ফেস, আনফ্যামিলিয়ার কনটেক্সট’ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গভীর। চিত্রশিল্প শুধু চারুকলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি মানুষের মননশীলতা ও জীবনকে নতুনভাবে দেখার একটি মাধ্যম। অথচ শিশুশ্রমিকরা জীবনের এই নান্দনিক ও সৃজনশীল দিক থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই তাদের ভেতরের সম্ভাবনা ও সৃজনশীলতাকে বিকশিত করার সুযোগ তৈরি করা আমাদের দায়িত্ব। ছবি আঁকা শেখানো শুধু একটি দক্ষতা অর্জন নয়, বরং নিজের জীবন ও চিন্তাকে নতুনভাবে প্রকাশ করার একটি পথ। এমন মানবিক ও সামাজিক উদ্যোগে চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানাই এবং এ ধরনের কার্যক্রমে সবসময় পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।
শিশুশ্রমের কারণ ও তাদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের বিষয় তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহিন মোল্লা বলেন, শিশুশ্রম ও অন্যান্য সামাজিক সমস্যা মোকাবিলায় ব্যক্তি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, সরকার ও এনজিওগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কোনো শিশুই স্বেচ্ছায় শ্রমে আসে না; পারিবারিক দারিদ্র্য, অভিভাবকের অনুপস্থিতি বা আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে তারা এ পথে বাধ্য হয়। তাই শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, সমস্যার মূল কারণ মোকাবিলায় আমাদের উন্নয়ন ও সামাজিক কাঠামো নিয়েও ভাবতে হবে। সরকার, এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পাশাপাশি ব্যক্তিগত উদ্যোগেও তহবিল গঠন ও সহায়তার মাধ্যমে এসব শিশুর পাশে দাঁড়ানো সম্ভব।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন দায়িত্বকে অতিরিক্ত বোঝা না করে ছোট ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রশাসন, ছাত্র সংসদ, হল প্রশাসন ও ছাত্রকল্যাণ সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে একটি উন্মুক্ত ফোরাম গঠন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কতজন শিশুশ্রমিক কাজ করছে, তাদের বয়স, আগ্রহ, দক্ষতা ও হলভিত্তিক অবস্থান নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে তাদের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কল্যাণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।
শিশুশ্রমের প্রতিকারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা তুলে ধরে অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ বলেন, 'জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তারা ক্যাফেটেরিয়া বা ডাইনিং হলে অনিশ্চিত ও নিরাপত্তাহীন জীবনযাপন করছে। আশির দশকে শিশু বা কিশোর শ্রমিকদের স্থায়ীকরণের একটি আন্দোলন সফল হলেও, বর্তমানে আমাদের বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার কারণে শিশুশ্রমের এই চক্রটি বারবার পুনর্বিকশিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নিয়ম ও আমাদের জাতীয় আইনে ১৮ বছরের নিচে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও, শুধুমাত্র আইন দিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; কারণ কোনো শিশুই শখে বা সুখে কাজ করতে আসে না।'
মূল সমস্যাটি জড়িয়ে আছে আমাদের জাতীয় উন্নয়ন মডেল ও সামাজিক কাঠামোর সাথে, যেখানে প্রায় ৮৫ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষ অনিশ্চিত ও অসংগঠিত খাতে কাজ করে। অভিভাবকদের পর্যাপ্ত আয় ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা না থাকায় বাধ্য হয়ে তারা সন্তানদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ঠেলে দেয়। ফলে এই শিশুরা যৌন নিপীড়ন, বৈষম্য এবং নানা ধরনের বঞ্চনার শিকার হয়ে অপরাধ জগতের হাতিয়ারে পরিণত হয়। একটি সমাজে যেখানে শিশুদের শৈশব, তরুণদের তারুণ্য এবং বৃদ্ধদের বার্ধক্যের নিরাপত্তা থাকে না, সে সমাজ কখনোই সুস্থ বা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র শিশুদের জীবনকেই ধ্বংস করছে না, বরং বহু সম্ভাবনাময় শিল্পী, বিজ্ঞানী বা মেধার অপমৃত্যু ঘটিয়ে পুরো জাতির অপূরণীয় ক্ষতি করছে। এই বিশাল জাতীয় সমস্যা মোকাবিলার দায় মূলত রাষ্ট্রের হলেও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরেও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।'
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর