১ আগস্ট বিশ্ব ফুসফুস ক্যান্সার দিবস। দিনটি শুধু একটি স্বাস্থ্য দিবস নয়, বরং এমন এক রোগ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার বৈশ্বিক উদ্যোগ, যা এখনও বিশ্বে ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর প্রধান কারণ। আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা (IARC)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ১৮ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এই রোগে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই রোগের প্রায় ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই তামাক বা ধূমপান প্রধান ঝুঁকির কারণ, তবে বর্তমানে বায়ুদূষণ, পরোক্ষ ধূমপান এবং কর্মস্থলের ক্ষতিকর রাসায়নিকও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে।
শুধু ধূমপায়ীদের রোগ নয়
দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুস ক্যান্সারকে কেবল ধূমপায়ীদের রোগ হিসেবে দেখা হলেও সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই ধারণা আর পুরোপুরি সত্য নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কখনও ধূমপান না করা মানুষের মধ্যেও ফুসফুস ক্যান্সারের হার বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে নগরাঞ্চলের বায়ুদূষণ, সূক্ষ্ম ধূলিকণা (PM2.5), শিল্পকারখানার ধোঁয়া এবং দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে বসবাস। বিশেষ করে এশিয়ার বড় শহরগুলোতে এই ঝুঁকি আরও বেশি।
শহুরে জীবনে কেন বাড়ছে ঝুঁকি?
বাংলাদেশের বড় শহর, বিশেষ করে ঢাকায় বসবাসকারীরা প্রতিদিনই নানা ধরনের দূষণের মুখোমুখি হন। যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা, ইটভাটার ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন, আবর্জনা পোড়ানোর ধোঁয়া এবং ঘরের ভেতরের দূষণ—সব মিলিয়ে ফুসফুস প্রতিনিয়ত ক্ষতির মুখে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শহুরে মানুষের জন্য প্রধান ঝুঁকিগুলো হলো—ধূমপান ও ই-সিগারেট ব্যবহার, পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শ, বায়ুদূষণ (PM2.5 ও PM10), অ্যাসবেস্টস, ডিজেল ধোঁয়া ও অন্যান্য শিল্প রাসায়নিক, দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগ, পারিবারিক বা জিনগত ঝুঁকি, ঘরের ভেতরের দূষণ ও রান্নার ধোঁয়া ইত্যাদি।
কোন লক্ষণগুলো অবহেলা করা যাবে না?
ফুসফুস ক্যান্সারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো লক্ষণই দেখা যায় না। তবে নিচের লক্ষণগুলো কয়েক সপ্তাহ ধরে থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী কাশি, কাশির সঙ্গে রক্ত আসা, শ্বাসকষ্ট বা হাঁপিয়ে যাওয়া, বুকে ব্যথা, কণ্ঠস্বর পরিবর্তন, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, বারবার নিউমোনিয়া বা বুকে সংক্রমণ, অতিরিক্ত দুর্বলতা ও ক্লান্তি ইত্যাদি।
শহরবাসী কীভাবে নিজেদের সুরক্ষিত রাখবেন?
ফুসফুস ক্যান্সারের সব কারণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়।
১. ধূমপান সম্পূর্ণ ত্যাগ করুন: এটি সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা। সিগারেট, বিড়ি, হুক্কা কিংবা ই-সিগারেট—কোনোটিই নিরাপদ নয়।
২. পরোক্ষ ধূমপান এড়িয়ে চলুন: বাড়ি, অফিস কিংবা রেস্টুরেন্ট—যেখানে ধূমপান হয়, সেখানে দীর্ঘ সময় অবস্থান না করাই ভালো।
৩. বায়ুদূষণের দিনে সতর্ক থাকুন: বাইরে বের হলে মানসম্মত মাস্ক (যেমন N95) ব্যবহার করুন। ভারী যানজটপূর্ণ এলাকায় দীর্ঘ সময় হাঁটা বা ব্যায়াম এড়িয়ে চলুন। সম্ভব হলে সকাল বা গভীর রাতে খোলা বাতাসে ব্যায়াম করুন, যখন দূষণ তুলনামূলক কম থাকে।
৪. ঘরের বাতাসও পরিষ্কার রাখুন: ধূমপানমুক্ত ঘর নিশ্চিত করুন। রান্নাঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন। ঘরে অতিরিক্ত ধোঁয়া বা রাসায়নিক স্প্রে ব্যবহার কমান।
৫. নিয়মিত শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, শাকসবজি ও ফলসমৃদ্ধ খাদ্য এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা রোগ প্রতিরোধে সহায়ক।
৬. ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের স্ক্রিনিং: যাঁদের দীর্ঘদিন ধূমপানের ইতিহাস রয়েছে বা ঝুঁকি বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে লো-ডোজ সিটি (Low-dose CT) স্ক্যান প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তে কার্যকর হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুসফুস ক্যান্সারকে শুধু চিকিৎসার মাধ্যমে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন সমন্বিত জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ। তাঁদের প্রধান পরামর্শ হলো—তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, শহরের বায়ুদূষণ কমাতে কার্যকর নীতি গ্রহণ, কর্মস্থলে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, উচ্চ ঝুঁকির মানুষের জন্য নিয়মিত স্ক্রিনিং কর্মসূচি চালু করা, কাশি বা শ্বাসকষ্টকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া, সচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বাড়ানো।
গবেষণা যা বলছে:
IARC-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফুসফুসের অ্যাডেনোকার্সিনোমা ধরনের ক্যান্সার ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং এর সঙ্গে বায়ুদূষণের সম্পর্ক স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একই সময়ে WHO ও IARC-এর যৌথ বিশ্লেষণ বলছে, বিশ্বে নতুন ক্যান্সারের প্রায় ৩৭ শতাংশ প্রতিরোধযোগ্য, আর প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সারের মধ্যে ফুসফুস ক্যান্সারের বড় অংশের পেছনে রয়েছে ধূমপান ও বায়ুদূষণ।
আমাদের করণীয়:
বিশ্ব ফুসফুস ক্যান্সার দিবসের মূল বার্তা একটাই—সচেতনতা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং দ্রুত শনাক্তকরণই জীবন বাঁচাতে পারে। ব্যক্তি পর্যায়ে ধূমপান ত্যাগ, দূষণ থেকে নিজেকে রক্ষা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পরিচ্ছন্ন বায়ু নিশ্চিত করা, তামাক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা এবং ক্যান্সার স্ক্রিনিং সহজলভ্য করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শহরের বাতাস পুরোপুরি আমাদের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও সচেতন জীবনযাপন, স্বাস্থ্যকর অভ্যাস এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে ফুসফুস ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। বিশ্ব ফুসফুস ক্যান্সার দিবস তাই কেবল একটি দিবস নয়—এটি সুস্থভাবে শ্বাস নেওয়ার অধিকার রক্ষার এক বৈশ্বিক অঙ্গীকার।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর