কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ও ফুলছড়ি রেঞ্জের সংরক্ষিত বন একসময় ছিল ঘন সবুজে আচ্ছাদিত। প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো সালগাছ, বন্যপ্রাণীর বিচরণ আর স্থানীয় মানুষের গবাদিপশুর চারণভূমি হিসেবে পরিচিত এই বন এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বনের ভেতরে গড়ে উঠেছে ফলের বাগান ও মুরগির খামার, পাহাড় ও বনভূমি সমতল করতে চলছে ভারী যন্ত্র, আর রাতের অন্ধকারে ড্রেজার ও স্কেভেটরের শব্দে মুখর হয়ে উঠছে সংরক্ষিত এলাকা।
বন বিভাগের মামলা, সরকারি নথি এবং এলাকাবাসীর ধারাবাহিক অভিযোগ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষিত বনভূমি দখল, রূপান্তর ও প্রাকৃতিক সম্পদ লুটে জড়িত রয়েছে। সেই চক্রের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বারবার উঠে এসেছে স্থানীয় বশির ড্রাইভারের ছেলে মোহাম্মদ আলী লিটনের নাম।
প্রতিবেদকের হাতে আসা বন বিভাগের মামলা, তদন্ত-সংক্রান্ত নথি এবং এলাকাবাসীর লিখিত অভিযোগপত্রে নরপাড়ি, গোদারপাড়ি, হরিখোলা ও কচুতলিয়া এলাকায় একই ধরনের অভিযোগে তাকে ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বারবার ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য মিলেছে। অভিযোগগুলোর ধরনও প্রায় একই। প্রথমে সংরক্ষিত বনের গাছ কেটে জমি দখল, এরপর বালু-মাটি ফেলে বা ভারী যন্ত্র দিয়ে ভূমির আকৃতি পরিবর্তন, পরে সেখানে ফলের বাগান, মুরগির খামার কিংবা কৃষিজমি তৈরি করে দখলকে স্থায়ী রূপ দেওয়া।
বন বিভাগের নথি বলছে, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে অন্তত তিনটি পৃথক মামলায় লিটন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে সংরক্ষিত বনভূমি দখল, ধ্বংস এবং অবৈধ ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে। হরিখোলা এলাকায় সংরক্ষিত বনে অবৈধ প্রবেশ, বনভূমির প্রাকৃতিক আকৃতি পরিবর্তন এবং বালু-মাটি পাচারের অভিযোগে লিটন (৩৫) ও তার ভাই মো. ইব্রাহিমকে (৩২) আসামি করা হয়। গোদারপাড়ি এলাকায় বনভূমি সাফ করে দখল এবং সেখানে মুরগির খামার স্থাপনের অভিযোগেও তাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। এছাড়া বনের জমি সমতল করে কৃষিকাজের উপযোগী করার অভিযোগে লিটন, ইব্রাহিম ও ইকবালকে আসামি করা হয়েছে। অন্যদিকে কচুতলিয়া এলাকায় সংরক্ষিত বনের গাছ কেটে ফলের বাগান গড়ে তুলে বনভূমি দখলের অভিযোগে লিটন ও জালাল ড্রাইভারকে আসামি করা হয়েছে। শুধু বন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ নয়। গত ২৩ জুলাই চকরিয়া থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় লিটনসহ ৮ থেকে ১০ জনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র হামলা, একটি বাছুরকে কুপিয়ে হত্যা এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, জঙ্গল খুটাখালী মৌজার দখল করা একটি বরই বাগানসংলগ্ন এলাকায় প্রবেশকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটে।
ক্রমবর্ধমান দখল ও পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগে শেষ পর্যন্ত মুখ খুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও। গত ২৪ জুলাই খুটাখালী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া স্মারকলিপিতে অভিযোগ করেন, লিটনের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি চক্র ড্রেজার ও স্কেভেটর দিয়ে দিন-রাত বসতভিটা, খতিয়ানভুক্ত জমি এবং আশপাশের এলাকা থেকে জোরপূর্বক বালু-মাটি উত্তোলন করছে। এতে বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
এরও আগে, গত ১৬ জুলাই পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে দেওয়া লিখিত আবেদনে এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, খুটাখালী মৌজায় বন বিভাগের ২ নম্বর খতিয়ানের আরএস ৬১ ও বিএস ৭০ দাগভুক্ত প্রায় ১৫ একর সরকারি বনভূমির সালগাছ কেটে বন বিভাগের অনুমতি ছাড়াই কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ফলের বাগান তৈরি করা হয়েছে। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, বহু বছর ধরে এলাকাটি ঘন সালবন ও গবাদিপশুর চারণভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।
ভুক্তভোগী আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইয়াসমিন আক্তার হ্যাপী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আতঙ্কের নাম আলী লিটন ও তার সহযোগীরা। সম্প্রতি তার মহিষের পাল ওই বিতর্কিত এলাকায় গেলে একটি বাছুরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় এবং আরেকটি মহিষ নিখোঁজ হয়ে যায়।
তার অভিযোগ, বনভূমি দখলের পাশাপাশি স্থানীয়দের ভয়ভীতি প্রদর্শনও নিয়মিত ঘটনা। তিনি নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। এদিকে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সূত্র ধরে চকরিয়া জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ারুল করিম বিষয়টি আমলে নিয়ে মামলা গ্রহণ করেছেন। এতে বিষয়টি স্থানীয় বিরোধের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিচারিক পর্যায়েও গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোহাম্মদ আলী লিটন। তিনি বলেন, 'আমি বন দখল, বালু উত্তোলন কিংবা কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নই। একটি মহল আমাকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন ও ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা অভিযোগ ও অপপ্রচার চালাচ্ছে।'
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন বলেন, 'লিটনের বিরুদ্ধে আমরা একাধিক মামলা করেছি। মামলা করার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া আদালতের বিষয়।'
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, বন বিভাগের নথি, মামলার তালিকা এবং এলাকাবাসীর ধারাবাহিক অভিযোগ একই ধরনের একটি প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তার মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দখলমুক্ত অভিযান পরিচালনা, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। মামলার পর মামলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে একের পর এক অভিযোগপত্র ও স্মারকলিপি। কিন্তু বনভূমি দখল ও রূপান্তরের অভিযোগ থামেনি। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়, সরকারি নথিতে জমা হওয়া অভিযোগগুলো কবে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেবে, আর খুটাখালী ও ফুলছড়ি রেঞ্জের অবশিষ্ট সংরক্ষিত বনভূমি আদৌ রক্ষা পাবে কি না।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর