আধঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে দুই থেকে তিন ঘণ্টা থাকছে না। টানা কয়েকদিন ধরে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ নাটোরের মানুষ। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার খেলায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
দিন হোক কিংবা রাত কোনো সময়ই নেই নিশ্চয়তা। আধঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পরই আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্ধকার। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নাটোর জেলার প্রায় সব উপজেলার মানুষ শহরের বাহিরে গড়ে ১৭ থেকে ১৮ ঘন্টা থাকছে না বিদ্যুৎ।
গুরুদাসপুর, সিংড়া, বাগাতিপাড়া, লালপুর, নলডাঙ্গা ও বড়াইগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার এই চক্র। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু, বৃদ্ধ, শিক্ষার্থী এবং কর্মজীবী মানুষ।
তীব্র গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরে থাকা দায় হয়ে উঠেছে। অনেক এলাকায় পানি তোলার মোটর বন্ধ থাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছেন না। রাতে ঘুমেরও ব্যাঘাত ঘটছে বারবার।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, আধঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে, তারপর দুই-তিন ঘণ্টা থাকে না। গরমে বাচ্চারা ঘুমাতে পারে না, বয়স্ক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এমন পরিস্থিতিতে খুব কষ্টে দিন কাটছে। দ্রুত এর সমাধান চাই।
লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। বিদ্যুৎনির্ভর ছোট ছোট ব্যবসা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। মেশিন বন্ধ থাকায় সময়মতো কাজ শেষ করতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। ফলে গ্রাহকের অর্ডার সরবরাহেও দেখা দিয়েছে জটিলতা।
লন্ড্রি ও টেইলার্স দোকান মালিক শাহিন বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় মেশিন চালাতে পারছি না। অনেক অর্ডার সময়মতো ডেলিভারি দিতে পারছি না। গ্রাহকদের কাছে বিব্রত হতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা চালিয়ে নেওয়া খুব কঠিন হয়ে যাবে।
একই অবস্থা প্রিন্টিং, ফটোকপি ও কম্পিউটারনির্ভর ব্যবসাগুলোতেও। দিনের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় দোকান খুলেও বসে থাকতে হচ্ছে অনেককে।
প্রিন্ট-ফটোকপি দোকান মালিক ইসমাইল হোসেন বলেন, প্রতিদিন আধঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে, এরপর দুই-তিন ঘণ্টা থাকে না। দোকান খোলা থাকলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। গত দেড় সপ্তাহ ধরে ব্যবসার অবস্থা খুব খারাপ।
শুধু ব্যবসাই নয়, সন্ধ্যার পর অনেক দোকান নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এতে কমছে বেচাকেনা, বাড়ছে আর্থিক ক্ষতি। ঔষধের মোমবাতি ও মোবাইলের লাইট জালিয়ে করতে হচ্ছে বিক্রি ও হিসাবের কাজ।
অপটিক্যাল দোকান মালিক শাহাদাত হোসেন বলেন, আগেও লোডশেডিং ছিল, কিন্তু গত কয়েকদিনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। গরমে শিশুদের কষ্ট হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় সন্ধ্যার পরই দোকান বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। বিক্রি অনেক কমে গেছে।
সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছেন জেলার শত শত পোলট্রি খামারি। বিদ্যুৎ না থাকায় খামারের কুলিং ফ্যান, এক্সহস্ট ফ্যান, পানির মোটর ও স্বয়ংক্রিয় খাবার সরবরাহ ব্যবস্থা বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে হিট স্ট্রেসে আক্রান্ত হচ্ছে মুরগি। অনেক খামারে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি মুরগি মারা যাওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক খামারিকে ডিজেলচালিত জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে, যা ছোট ও মাঝারি খামারিদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করেছে।
মুরগি খামারি রানা মাসুদ বলেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় আমাদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে। খামারের ভেতরে ফ্যান, কুলিং সিস্টেম ও পানির মোটর বন্ধ হয়ে যায়। প্রচণ্ড গরমে মুরগিগুলো হিট স্ট্রেসে আক্রান্ত হচ্ছে, খাবার কম খাচ্ছে, উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। ছোট বাচ্চা (ব্রয়লার/লেয়ার) মুরগি মারা যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। জেনারেটর চালাতে অতিরিক্ত ডিজেল খরচ হচ্ছে, এতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে খামার টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
এবিষয়ে নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর এজিএম মমিনুল ইসলাম জানান, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি থাকায় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না এটা একটি জাতীয় সমস্যা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে লোডশেডিং কমে আসবে।
ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ নাটোরবাসী এখন দ্রুত স্থায়ী সমাধান চান। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হলে জনদুর্ভোগের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
রোহান/সা.এ.
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর