যে জুলাই যোদ্ধার রক্তে সাভারের রাজপথে লেখা হয়েছিল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস, আজ তিনি নিজেই ‘ছাত্র হত্যা’ মামলার আসামি হয়ে কারাগারে। পরিবারের দাবি, কোনো প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই রাজনৈতিক প্রভাব ও অনৈতিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে তাকে মামলায় জড়ানো হয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা তরুণ মেহেদী হাসান রিয়াজ (২৫) পরিবারের অমত সত্ত্বেও গত বছরের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সাভারের আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। স্বজনদের ভাষ্য, বুলেট ও টিয়ারশেলের মুখে রাজপথে অবস্থান নেওয়া সেই আন্দোলনকারীই এখন হত্যামামলার আসামি।
রিয়াজ দীর্ঘ সাত-আট বছর ধরে সাভার নিউমার্কেটের ভূগর্ভস্থ তলায় অবস্থিত ‘আদিল এক্সপোর্ট’ নামের একটি কাপড়ের দোকানে সেলসম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত ১৩ জুলাই বিকেলে কর্মস্থল থেকেই সাভার মডেল থানার পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাভার মডেল থানার ০৪/২৪ নম্বর মামলায় ১৪ জুলাই তাকে আদালতে পাঠানো হয়। পরিবারের অভিযোগ, কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই সরকারি চালানে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের স্থানে ‘ছাত্রলীগ কর্মী’ উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও তিনি কখনো ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
পরিবারের অভিযোগ, পুরো ঘটনার নেপথ্যে রয়েছেন সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) নেয়ামত উল্লাহ। তাদের দাবি, একটি প্রভাবশালী মহলকে সুবিধা দিতে এবং অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে রিয়াজকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে আন্দোলনের সময়কার ছবি, ভিডিও ও সহযোদ্ধাদের বক্তব্যে রিয়াজের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
রিয়াজের বোন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,আমি আর আমার ভাই দুজনই পরিবারের অমতে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম। ১৯ জুলাই সাভারে হামলার সময়ও সে রাজপথে ছিল। আমার ভাই সম্পূর্ণ নির্দোষ। তার উপার্জনের টাকায় আমাদের পড়াশোনা ও অসুস্থ বাবার চিকিৎসা চলত। তদন্ত ছাড়াই এসআই নিয়ামত উল্লাহ তাকে গ্রেপ্তার করেছেন।
আন্দোলনের সহযোদ্ধা মেহেদী হাসান মুন্না বলেন, ১৪, ১৬ ও ১৮ জুলাই সাভারে গুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপের সময় রিয়াজ আমাদের সঙ্গে সামনের সারিতে ছিল। টিয়ারগ্যাসের প্রভাব কমাতে সে কাঠ-খড় জোগাড় করে আগুন জ্বালিয়েছিল। যে ছেলে জীবন বাজি রেখে আন্দোলন করেছে, তাকে কীভাবে হত্যাকারী বানানো হয়?
রিয়াজের বাবা বেলাল উদ্দিন মনা অভিযোগ করেন, ব্যবসা সংক্রান্ত বিরোধ ও আত্মীয়তার সূত্র ধরে তৈরি হওয়া শত্রুতার জেরেই তার দুই ছেলেকে মামলায় জড়ানো হয়েছে।
তিনি জানান, সাভার পৌরসভার সাবেক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও বর্তমানে মৃত কারাবন্দী আব্দুর রাজ্জাক তার আত্মীয় ছিলেন। আত্মীয়তার সূত্রে তিনি একসময় রাজ্জাকের কিছু ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। রাজ্জাকের মৃত্যুর পর ব্যবসার একটি অংশের দায়িত্ব তার ওপর আসে। ওই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতেই প্রতিপক্ষ একটি মহল তার দুই ছেলের নাম জুলাইয়ের হত্যা মামলায় অন্তর্ভুক্ত করেছে বলে তিনি দাবি করেন।
আদিল এক্সপোর্ট’-এর স্বত্বাধিকারী ইব্রাহিম বলেন, রিয়াজ গত সাত-আট বছর ধরে আমার দোকানে কাজ করছে। সে অত্যন্ত শান্ত ও ভদ্র ছেলে। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল না। ঘটনার দিন দোকান থেকেই পুলিশ তাকে নিয়ে যায়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে উপ-পরিদর্শক (এসআই) নেয়ামত উল্লাহর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক চম্পক বড়ুয়া বলেন, মেহেদী হাসান রিয়াজ এজাহারভুক্ত আসামি হওয়ায় নিয়মিত অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন। তদন্তে তার সম্পৃক্ততা না পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী চার্জশিট থেকে নাম বাদ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, তৎকালীন ঘটনার বিস্তারিত আমার জানা নেই। ভুক্তভোগী পরিবার যদি চালানের কপি ও আন্দোলনে অংশগ্রহণের প্রমাণাদি জমা দেয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে আমরা সতর্ক। কোনো পুলিশ সদস্য ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকলে তার বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, যদি তিনি সত্যিই জুলাই আন্দোলনের একজন সক্রিয় যোদ্ধা হয়ে থাকেন এবং ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাকে আসামি করা হয়ে থাকে, তবে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনীর আলোকে এ ধরনের হয়রানির শিকার ব্যক্তিদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা উচিত।
রোহান/সা.এ.
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর