ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি (আইসিটি) বিভাগের অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী ফিরোজা নাজনীনের প্রভাষক পদে নিয়োগকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি তার নিয়োগে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে নিয়োগপত্র স্থগিত রাখা হয়। এ বিষয়ে তদন্ত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে। এরই মধ্যে ফিরোজা নাজনীনের প্রকাশিত গবেষণাপত্রের মান, লেখক হিসেবে তাঁর ভূমিকা এবং গবেষণায় তাঁর অবদান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ফিরোজা নাজনীনের প্রকাশনা তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ফিরোজা নাজনীনের মোট ১৬টি গবেষণা প্রকাশনা রয়েছে। এর মধ্যে ৬টি জার্নাল আর্টিকেল, ৯টি কনফারেন্স পেপার এবং ১টি বুক চ্যাপ্টার। ১৬টি প্রকাশনার মধ্যে মাত্র একটি কনফারেন্স পেপারে তিনি প্রথম (First Author) লেখক হিসেবে রয়েছেন। বাকি ১৫টি প্রকাশনার একটিতেও তিনি ফার্স্ট অথর নন। সেগুলোতে তিনি দ্বিতীয়, তৃতীয় বা পরবর্তী লেখক হিসেবে রয়েছেন। ২০১৫, ২০১৭, ২০১৯, ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে প্রকাশিত ৬টি জার্নালে তিনি দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং পরবর্তী অথর হিসেবে রয়েছেন। ৯টি কনফারেন্স পেপারের মধ্যে কেবল ২০২৪ সালের একটি কনফারেন্সে তিনি প্রথম লেখক হিসেবে রয়েছেন।
গবেষণা বিশেষজ্ঞদের মতে, গবেষণাপত্রে ফার্স্ট অথর সর্বাধিক অবদান রাখেন। সাধারণত তিনি গবেষণার পরিকল্পনা, তথ্য সংগ্রহ, তথ্য বিশ্লেষণ এবং গবেষণাপত্রের মূল খসড়া তৈরিতে নেতৃত্ব দেন। গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন ও প্রবন্ধ সংশোধনের ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে গবেষণায় সর্বাধিক অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁর নাম লেখকদের তালিকায় প্রথমে উল্লেখ করা হয়। সে দৃষ্টিকোণ থেকে ফিরোজা নাজনীনের প্রকাশনাগুলোর মধ্যে জার্নাল আর্টিকেলে প্রথম লেখক হিসেবে তাঁর কোনো প্রকাশনা পাওয়া যায়নি।
গবেষণা প্রকাশনায় ফার্স্ট অথরের ভূমিকার বিষয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শামীম হোসেন বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মূল গবেষণার কাজটি ফার্স্ট অথরই করেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে জয়েন্ট ফার্স্ট অথর থাকে। অর্থাৎ, দুইজন গবেষকের অবদান সমান হওয়ায় তাঁদের যৌথভাবে প্রথম লেখক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে Corresponding লেখকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়। তবে সেকেন্ড, থার্ড বা পরবর্তী লেখকদের ভূমিকা বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে অনেক ক্ষেত্রে সীমিত থাকে। অনেক সময় গবেষণাপত্রে তাঁদের নাম যুক্ত করা হলেও গবেষণায় তাঁদের প্রত্যক্ষ অবদান খুব বেশি থাকে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেকেন্ড, থার্ড বা পরবর্তী লেখকরা শুধু পাণ্ডুলিপি (ম্যানুস্ক্রিপ্ট) পর্যালোচনা (রিভিউ) করেন, আবার অনেক ক্ষেত্রে সেটিও করেন না। তাই বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে অনেক সময় ধরে নেওয়া হয় যে, পরবর্তী লেখকদের মধ্যে কেউ কেউ কেবল নামমাত্র যুক্ত থাকেন।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সিনিয়র গবেষক বলেন, কনফারেন্স পেপারগুলো আসলে আমাদের প্রমোশন বা অন্য কোনো একাডেমিক কাজে তেমন কোনো ভূমিকা রাখে না। আমাদের ক্ষেত্রে এগুলো অনেকটা অর্নামেন্টাল—অর্থাৎ কনফারেন্সে অংশগ্রহণের একটি রেকর্ড হিসেবে থাকে, কিন্তু এগুলো দিয়ে বাস্তবে তেমন কোনো কাজ করা যায় না। ফিরোজা নাজনীনের ৬টি জার্নালের মধ্যে একটি তুলনামূলক ভালো। দুটো স্কোপাস আছে। আর বাকি তিনটি সাধারণ জার্নাল।
ফিরোজা নাজনীনের গবেষণাপত্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে কনফারেন্স পেপার। তবে এসব কনফারেন্স পেপারের মাত্র একটিতে তিনি ফার্স্ট অথর হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। অন্যগুলোতে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও পরবর্তী লেখক হিসেবে রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট গবেষকদের মতে, কনফারেন্স সাধারণত গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ বা ফলাফল উপস্থাপনের একটি মাধ্যম। কিন্তু সাধারণভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত অধিকাংশ কনফারেন্সের একাডেমিক গুরুত্ব তুলনামূলক কম। কনফারেন্স মূলত নির্দেশ করে যে, কেউ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত আছেন। তাই সাধারণভাবে কনফারেন্স পেপারকে উচ্চমানের গবেষণার সমপর্যায়ের প্রকাশনা হিসেবে ধরা হয় না।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামীম হোসেন বলেন, কারও যদি দুই-একটি কনফারেন্স পেপার থাকে, তাহলে একজন গবেষক বা অধ্যাপক ধারণা করতে পারেন যে, তিনি গবেষণার সঙ্গে যুক্ত আছেন। But it's not a big achievement. কেউ গবেষণায় আগ্রহী বা গবেষণা শুরু করেছেন—কনফারেন্স পেপার থাকলে সেটি মোটামুটি বোঝা যায়। তবে কিছু কিছু হেভিওয়েট কনফারেন্সও রয়েছে।
গবেষণারত এক শিক্ষার্থী বলেন, একটা কাজ আমি করেছি, আর একটা কাজ করেছে আমার বন্ধু। এরপর আমি আমার বন্ধুকে বললাম, “তোর পেপারটাতে আমার নাম দিয়ে দিস, আর আমার পেপারটাতে আমি তোর নাম দিয়ে দেব।” এতে আমাদের দুজনেরই দুইটা করে পেপার হয়ে গেল। তখন আমি বলতে পারব, “হ্যাঁ, আমার দুইটা পেপার আছে।” অর্থাৎ, কোনো প্রকৃত গবেষণা-অবদান ছাড়াই একে অপরের নাম লেখক হিসেবে যুক্ত করে প্রকাশনার সংখ্যা বাড়ানো হয়।
এ বিষয়ে ফিরোজা নাজনীন বলেন, রিসার্চ কখনোই শুধু একজন ব্যক্তির কাজ নয়। কলাবোরেটিভ রিসার্চে সবসময় একাধিক মানুষ অবদান রাখেন। কে কতটুকু অবদান রেখেছেন, তার ওপর ভিত্তি করেই সাধারণত অথরশিপের সিরিয়াল নির্ধারণ করা হয়। কোনো কন্ট্রিবিউশন ছাড়া আপনার অথরশিপ আসবে না। ভালো রিসার্চাররা এ বিষয়ে আরও ভালো ধারণা দিতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, আমি যেহেতু এখনো আমার পিএইচডি শেষ করিনি, তাই আমার পাবলিকেশনগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই কো-অথরশিপের মাধ্যমে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি বেশি প্রাসঙ্গিক। আপনি যখন বিএসসি বা এমএসসিতে থাকবেন, তখন সাধারণত আপনার সুপারভাইজারের সঙ্গে কাজ করবেন। সেক্ষেত্রে আপনার কন্ট্রিবিউশন অনুযায়ী আপনি অথরশিপের সামনের দিকে থাকতে পারেন। পরবর্তীতে আপনি যখন শিক্ষকতায় যাবেন এবং আপনার নিজের স্টুডেন্টদের সঙ্গে রিসার্চ করবেন, তখন অনেক ক্ষেত্রে আপনার স্টুডেন্টরাই গবেষণার মূল কাজগুলো করবে এবং আপনি সুপারভাইজার হিসেবে পিছনের দিকে অথর হিসেবে থাকবেন।
এর আগে ফিরোজা নাজনীনের নিয়োগ নিয়ে স্বজনপ্রীতি, একাডেমিক ফলাফল এবং নিয়োগ বোর্ডের আগের দিন বিশেষজ্ঞ সদস্যের সঙ্গে তার স্বামীর সাক্ষাৎ নিয়ে অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের পাশাপাশি এবার তার গবেষণা-প্রকাশনার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
ক্যাম্পাস এর সর্বশেষ খবর