ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়ার কয়েকটি নিকটতম দেশ যেমন- জাপান, ফিলিপাইন, ভারত, পাকিস্তানে এ বছর ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে বেশ কিছু মানুষ হতাহত হয়।
জাপান:
জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কুয়োশু দ্বীপের কুমামোতো গত ২৮ জুলাই, ২০২৬ সালে অঞ্চলে ৬.৮ মাত্রার (স্থানীয় পরিমাপে ৭.১) একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এই ভূমিকম্পে ৩৮ জনের মৃত্যু হয় এবং ১৭০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হন।
ফিলিপাইন:
ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনদানাও দ্বীপের উপকূলে গত ৮ জুন, ২০২৬ সালে ৭.৮ মাত্রার একটি অত্যন্ত ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে। এই দুর্যোগে অন্তত ৭৬ জন প্রাণ হারান এবং ৪ শতাধিক মানুষ আহত হন।
ভারত:
ভারতের মহারাষ্ট্র ও উত্তরাখণ্ডে এ বছর ৮ আগস্ট নাশিক অঞ্চলে ৪.৩ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার ফলে কিছু বাড়ির দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়।
পাকিস্তান:
পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মান্ডি বাহাউদ্দিন জেলাকে কেন্দ্র করে ৪.৫ মাত্রার একটি মাঝারি ভূমিকম্প আঘাত হানে, যার কম্পন ভারতের সীমান্ত এলাকাতেও অনুভূত হয়।
শক্তিশালী এসব ভূমিকম্পের পর বাংলাদেশেও বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে ছোট ছোট ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ছোট কম্পন বড় ভূমিকম্পের নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়, তবে বাংলাদেশের ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থান বিবেচনায় শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, রাজধানী ঢাকায় ৬ থেকে ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানলে ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটতে পারে। দুর্বল নির্মাণমানের কারণে অসংখ্য ভবন ধসে পড়তে পারে এবং এতে প্রাণহানি হতে পারে ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষের।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, ৭ থেকে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প বাংলাদেশে যে কোনো সময় ঘটতে পারে। তিনি জানান, অতীতে ১৮৬৯ সালে কাছাড়ে ৭ দশমিক ৫, ১৮৮৫ সালে বেঙ্গল ভূমিকম্পে ৭ দশমিক ১, ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ৭ দশমিক ৬ এবং ১৯৩০ সালে ধুবড়িতে ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। ১৫০ থেকে ২০০ বছরের ভূমিকম্প চক্র বিবেচনায় এখন আবারও বড় ধরনের কম্পনের সম্ভাবনা রয়েছে।
এসব আশঙ্কাকে আমলে নিয়ে ভূমিকম্প থেকে উত্তরণে কাজ করছে সরকার। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানিয়েছেন, রাজধানীতে ভূমিকম্পসহ নগর দুর্যোগ মোকাবিলায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে মোট ৪৪৫টি ‘নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ চিহ্নিত করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, নগর দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৫৬টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৮৯টিসহ মোট ৪৪৫টি ভূমিকম্পের নিরাপদ আশ্রয়স্থল চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব আশ্রয়স্থল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবটি এখন অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
এছাড়া ঢাকা মহানগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া প্রদানের লক্ষ্যে ১ লাখ স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আওতাধীন স্বেচ্ছাসেবকদের তথ্য সংগ্রহ করে একটি সমন্বিত স্বেচ্ছাসেবক ডাটাবেজ প্রস্তুতের কাজ চলমান রয়েছে বলেও জানান দুর্যোগমন্ত্রী।
উল্লেখ্য, সরকার এখনো থানা বা এলাকাভিত্তিক ৪৪৫টি আশ্রয়স্থলের সুনির্দিষ্ট নামের তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি। জাতীয় সংসদে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের চিহ্নিত এই স্থানগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'নিরাপদ আশ্রয়স্থল' হিসেবে ঘোষণা করার প্রক্রিয়াটি বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
তবে সরকারের নগর দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস পরিকল্পনা ও ফায়ার সার্ভিসের নির্দেশিকা অনুযায়ী কোন কোন স্থানগুলো ভূমিকম্পে আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হবে, তার একটি ধারণা নিচে দেওয়া হলো:
সম্ভাব্য আশ্রয়স্থল চেনার উপায়
উন্মুক্ত খেলার মাঠ: আপনার এলাকার বড় সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক খেলার মাঠ।
পাবলিক পার্ক: গাছপালা ঘেরা বড় উন্মুক্ত উদ্যান বা পার্ক।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,
বুয়েট বা বড় সরকারি স্কুল-কলেজের খোলা প্রাঙ্গণ।
বিস্তীর্ণ খালি জায়গা: বহুতল ভবন থেকে দূরে অবস্থিত যেকোনো বড় ফাঁকা স্থান।
রোহান/সা.এ.
সর্বশেষ খবর
জাতীয় এর সর্বশেষ খবর