চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড উপজেলার ভাটিয়ারি ইউনিয়নের স্টেশন রোড উপকূল এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ রিতিমতন মৃত্যুর উপত্যকায় পরিণত হয়েছে৷ ইয়ার্ডটিতে এলএনজি জাহাজ স্ক্র্যাপ কাজের সময় বিষাক্ত গ্যাসে শ্রমিকের মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৮ জন৷
সর্বশেষ দুপুর ২টা ২০ মিনিটে হাবিবুর রহমান নামের এক শ্রমিককে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে আনা হলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষনা করেন৷ নিহতের মধ্যে দুই সহদোরও রয়েছে৷ যদিও এখন পর্যন্ত সাত জনের পরিচয় মিলেছে৷ তাঁরা হলেন সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর সানী জলদাশ (২২), পলাশ জলদাশ (২৭), মুনছুর আলী (৪০), নাসির উদ্দিন (৩৮) এবং জামালপুরের হাবীবুর রহমান, গাইবান্ধার খোকন এবং আব্দুল আমীল রানা। এই ঘটনায় আহত হয়েছে আরও আন্তত ৭-৮ জন৷ আহতদের স্বজনদের আশংকা মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে৷
হতাহতদের উদ্ধারে গিয়েও অনেকে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন৷ এই বিষাক্ত গ্যাসের ভয়াবহতা এতোটাই ব্যাপক ছিল যে ঘটনার কয়েক ঘন্টা পরও ঘটনাস্থলের আশেপাশে অন্তত ৫০০ গজের মধ্যে নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়া চলাচল করতে বেগ পেতে হচ্ছিলো৷ এসময় ঘটনার সংবাদ সংগ্রহে যাওয়া একজন সাংবাদিকও সজ্ঞা হারান৷ তাঁকে ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে প্রেরণ করে৷
ধারণা করা হচ্ছে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা মূলক নির্দেশনা না মানার কারণে এই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে৷ অভিযোগ উঠেছে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ পদে পদে নিয়ম নীতি লংঘন করে ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজ ভাঙ্গার কাজ করছিলেন৷ নিজেদের গ্রিণ শিপ ইয়ার্ড দাবী করলেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে শিপইয়ার্ডটি গ্রিণ শিপইয়ার্ড ক্যাটাগরির জন্য আবেদিত একটি প্রতিষ্ঠান৷ এখন পর্যন্ত গ্রিন শিপইয়ার্ড হওয়ার মতন যোগ্যতার ৪০% পূরণ করতে পেরেছে শিপ ইয়ার্ডটি৷ এই ঘটনার পর শিপ ইয়ার্ড গুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে দেশে-বিদেশে বিরুপ বার্তা পৌছাবে বলে আশংকা করছে শিপ ব্রেকিং সংশ্লিষ্টরা৷
যদিও বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন বিডি২৪লাইভকে বলেছেন, ঘটনার পর পরই আমরা ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছি৷ তদন্ত কমিটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দিলে সেই মোতাবেক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে৷ তিনি আরও বলেন, "ঘটনার সংবাদ পাওয়ার পর থেকে আমিসহ বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিতে সার্বিক তদারকি করে যাচ্ছি৷ শ্রমিক ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে কারো গাফিলতি থাকলে তা ছাড় দেয়া হবে না৷"
*ছিলো না পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, বন্ধের দিলেও চলছিল কর্মযজ্ঞ :*
স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, জাহাজটি দীর্ঘদিন ধরেই ইয়ার্ডে ভেড়ানো ছিলো৷ তাদের ধারণা ছিল বিষাক্ত গ্যাস অপসারণের কারণে দীর্ঘ বিলম্বে জাহাজটি কাটার কাজ শুরু হয়েছে৷ সকাল ৯টার দিলে জাহাজটি থেকে আর্তচিৎকার শুনে আশপাশে এলাকার বাসিন্দারা ছুটে এসে শ্রমিকদের উদ্ধার করে৷ অসুস্থ শ্রমিকদের স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা জানান, ঘটনাস্থলেই তাঁদের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা সুরুজ মিয়া বিডি২৪লাইভকে বলেন, ইয়ার্ডের ভেতর থেকে বের হওয়া গ্যাসের গন্ধের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে সেখানে যাওয়ার সাথে সাথে মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছিলো৷ এক পর্যায়ে তীব্র গ্যাস অন্তত ৫০০ গজ দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে৷ এসময় ইয়ার্ডের নিজস্ব কোন উদ্ধার কর্মী বা সেফটি টিমের সদস্যকে দেখা যায়নি বলেও জানান তিনি৷
শুক্রবার বন্ধের দিন ইয়ার্ড বন্ধ থাকার কথা থাকলেও আজ বন্ধের দিনে কথিত ওভার টাইমের নামে শ্রম আইন লংঘন করে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই শ্রমিকদের দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছিলো বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা৷
জাহাজ ভাঙ্গার সাথে দীর্ঘদিন সংশ্লিষ্ট এক শ্রমিক বিডি২৪লাইভকে বলেন, সাধারণত কয়েকটি ক্যাটাগরির জাহাজ স্ক্রেপ করা হয়৷ কিছু জাহাজ বিপদ জনক হিসেবে আগে থেকেই চিহ্নিত থাকে৷ এই জাহাজটিও সেই ক্যাটাগরিতে ছিল৷ নিয়ম হচ্ছে আগে জাহাজের বিপদ জনক সরঞ্জাম, ক্যামকেল ও গ্যাস আগে নিরাপদে অপসারণ করতে হবে৷ তার পরই জাহাজে কাটার ব্যবহার করে জাহাজটি স্ক্রেপ করতে হয়৷ এই জাহাজটির ভেতর পর্যাপ্ত বিষাক্ত গ্যাস মজুদ জানান দিচ্ছে এটি সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত না করেই স্ক্রেপের কাজ চালানো হচ্ছিলো৷ যা পরিবেশ ও প্রাণের জন্য হুমকি।
দিকে এই ঘটনার অন্তত দুই ঘন্টা পর ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে৷ স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস সূত্র বলছে, আনুমানিক সকাল ৯টায় দুর্ঘটনা ঘটলেও তাদেরকে জানানো হয় সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে। ফায়ার সার্ভিসকে খবর না দিয়েই ঘটনার পর পর পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও উদ্ধার সরিঞ্জাম ছাড়া এ ধরণে দুর্ঘটনায় উদ্ধার কাজ পরিচালনা করতে গিয়েও অনেকে হতাহত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে৷
এমতাবস্থায় ইয়ার্ডটিতে গ্যাসের বিষাক্ততা পরীক্ষার জন্য সার্টিফাইড কোনো সেফটি অফিসার বা গ্যাস ফ্রি সার্টিফিকেট তদারকির ব্যবস্থা ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেয়া দিয়েছে।
*ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের যা যা বলছেন :*
ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ এর ইয়ার্ড ম্যানেজার মোহাম্মদ ইউসুফ জানান, শুক্রবার ইয়ার্ডের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। সকালে স্ক্র্যাপ এলএনজি জাহাজের একটি ট্যাংকে লিকেজ দেখা দেয়। এ সময় স্থানীয় ও বহিরাগত কয়েকজন লোক বিষয়টি দেখতে সেখানে গেলে গ্যাসে আক্রান্ত হন। কয়েকজন আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে ফেরদৌস স্টিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস ওয়াহিদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, ইয়ার্ডের নিজস্ব সেফটি টিম প্রথমে একটি ট্যাঙ্ক থেকে গ্যাস নির্গমন হতে দেখে। পরে সেফটি টিমের কয়েকজন সদস্য গ্যাস লিকের বিষয়টি পরীক্ষা করতে গেলে ঘটনাস্থলেই বেশ কয়েকজন শ্রমিক আহত হন।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর