মৌসুমের শুরুতে ভালো দাম পেলেও হঠাৎ বাজারদর পড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন রাজশাহীর পাটচাষিরা। পবা উপজেলার নওহাটা পাটের হাটে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে মণপ্রতি পাটের দাম কমেছে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। এতে উৎপাদন খরচ তুলে কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন কৃষকেরা।
সোমবার ও বৃহস্পতিবার ভোরে নওহাটা হাটে পাট নিয়ে ভিড় করেন আশপাশের বিভিন্ন এলাকার কৃষক। ভ্যান, নসিমন ও ভটভটিতে করে আনা হয় সদ্য কাটা ও প্রক্রিয়াজাত পাট। তবে বাজারে এসে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় অনেক কৃষক পাট বিক্রি না করেই বাড়ি ফিরছেন।
হাট সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহ দুয়েক আগেও মানভেদে প্রতি মণ পাট ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে একই মানের পাটের দর নেমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ২০০ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায়। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে কৃষকের প্রতি মণ পাটে আয় কমেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে।
পবা উপজেলার পদ্মার চর এলাকার কৃষক সাইফুল ইসলাম এবার ৬৫ মণ পাট নিয়ে হাটে আসেন। এর আগে একই মানের পাট ৪ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করেছিলেন তিনি। বর্তমান বাজারদর নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, কয়েক দিন আগেও যে দামে পাট বিক্রি করেছি, এখন তার চেয়ে অনেক কম দর দেওয়া হচ্ছে। চাষাবাদের খরচ বেড়েছে, অথচ পাটের দাম এভাবে কমে গেলে কৃষকের লাভ থাকবে না।
একই পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন দারুশা এলাকার কৃষক বাবু। প্রায় ১৪৯ কেজি পাট নিয়ে নওহাটা হাটে এসে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মণপ্রতি ৩ হাজার ৪০০ টাকা দর পান। কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় পাট বিক্রি না করে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যান তিনি। তার ভাষ্য, আগেরবার ৪ হাজার টাকা মণ দরে পাট বিক্রি করেছেন। এবারও কাছাকাছি দাম পাওয়ার আশা ছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীরা কম দাম বলায় লোকসানের আশঙ্কায় পাট বিক্রি করেননি। বাড়িতে আরও পাট রয়েছে, দাম কিছুটা বাড়লে সেগুলো বাজারে তুলবেন।
মোহনপুরের কেশরহাট এলাকার কৃষক সালমান আলীও একই কারণে পাট ফেরত নিয়ে যান। ভালো মানের সাড়ে চার মণ পাট নিয়ে হাটে এলেও ৪ হাজার টাকা মণ দর প্রত্যাশা করছিলেন তিনি। ব্যবসায়ীরা সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার টাকা দিতে চাওয়ায় বিক্রি না করেই ফিরে যান।
কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে নতুন পাট আসার সুযোগে একশ্রেণির ব্যবসায়ী কম দামে পাট কেনার চেষ্টা করছেন। এতে উৎপাদন খরচ ও শ্রমের তুলনায় কৃষকের হাতে লাভ থাকছে খুবই কম। মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে সরবরাহ আরও বাড়লে দাম আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন তারা। তবে ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, বাজারদর কমার পেছনে মূল কারণ সরবরাহ বেড়ে যাওয়া। নওহাটার পাট ব্যবসায়ী মিলন আলী বলেন, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে পাটের সরবরাহ কম থাকায় বেশি দামে পাট কিনতে হয়েছে। এখন নতুন পাট বাজারে আসায় সরবরাহ বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই দাম কিছুটা কমেছে। আগের দামে কেনা পাটও অনেক ব্যবসায়ীর মজুত রয়েছে।
নওহাটা পাট হাটের ইজারাদার অমল দাস জানান, প্রতি সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার ভোর থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত হাটে পাট কেনাবেচা হয়। প্রতিটি হাটে গড়ে প্রায় ২ হাজার মণ পাট লেনদেন হয়ে থাকে। বর্তমানে মানভেদে পাটের দর ৩ হাজার ২০০ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকার মধ্যে রয়েছে। পাট অধিদপ্তর রাজশাহীর সহকারী পরিচালক নাদিম আক্তার বলেন, পাটের দাম মূলত বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করে। বর্তমানে সরকারিভাবে পাটের নির্দিষ্ট ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয় না। নওহাটা এলাকায় কয়েকটি জুট মিল থাকায় এসব মিলের পাট কেনার পরিমাণের ওপরও স্থানীয় বাজারদরে প্রভাব পড়ে। মিলগুলো বেশি পাট কিনলে চাহিদা বাড়ে, আবার কম কিনলে বাজারে তার প্রভাব পড়ে।
তিনি আরও জানান, চলতি বছর রাজশাহীতে প্রায় ৩ লাখ ৮১ হাজার ৬৯৬ কুইন্টাল পাট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। গত বছর উৎপাদন হয়েছিল ৩ লাখ ৬০ হাজার ৪৯৪ কুইন্টাল। অর্থাৎ এবার উৎপাদন বাড়তে পারে প্রায় ২১ হাজার ২০২ কুইন্টাল। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। গত বছর আবাদ হয়েছিল ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে। এক বছরে আবাদ বেড়েছে ১ হাজার ৯৪ হেক্টর। আগাম জাতের পাটে কৃষকেরা ভালো দাম পেয়েছেন। তবে একসঙ্গে বেশি পাট বাজারে উঠলে সরবরাহ বৃদ্ধির কারণে দাম কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
ফলন ভালো হওয়ায় চলতি মৌসুমে পাটচাষিদের মুখে স্বস্তি ফেরার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু হাটে এসে দরপতনের মুখে সেই আশায় ভাটা পড়েছে। এখন কৃষকদের দাবি—উৎপাদন খরচ বিবেচনায় রেখে পাটের ন্যায্য বাজারদর নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভালো ফলন করেও লোকসানের মুখে পড়তে না হয়।
রোহান/সা.এ.
সর্বশেষ খবর