ঢাকা থেকে কক্সবাজার সরাসরি রেল যোগাযোগ আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল। চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত মহানগর এক্সপ্রেসের রুট সম্প্রসারণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে রেলভবনে। গত ১৭ আগস্ট পাঠানো ওই প্রস্তাব অনুমোদন পেলে নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও ফেনীসহ পথে থাকা বিভিন্ন স্টেশনের যাত্রীরা ট্রেন পরিবর্তন ছাড়াই সরাসরি কক্সবাজার যেতে পারবেন।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ৭২১ ও ৭২২ নম্বর মহানগর এক্সপ্রেস ঢাকা-কক্সবাজার রুটে চলাচল করবে। ৭২১ নম্বর ট্রেনটি রাত সাড়ে ৮টায় ঢাকা ছেড়ে পরদিন ভোর ৬টায় কক্সবাজারে পৌঁছাবে। ফিরতি ৭২২ নম্বর ট্রেন সকাল ৯টায় কক্সবাজার থেকে ছেড়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। বর্তমানে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে চলাচলকারী কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও পর্যটক এক্সপ্রেসের তুলনায় মহানগর এক্সপ্রেসের সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে এর বেশি সংখ্যক যাত্রাবিরতি।
প্রস্তাবিত রুটে ট্রেনটি নরসিংদী, ভৈরব, আশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া, কসবা, কুমিল্লা, লাকসাম, নাঙ্গলকোট, ফেনী ও কুমিরায় থামবে। ফলে রুটটি চালু হলে শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রাম নয়, দেশের পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি জেলা থেকেও কক্সবাজারে সরাসরি ট্রেনে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও ফেনীর সঙ্গে কক্সবাজারের সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে।
দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০২ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণের পর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কক্সবাজার দেশের রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়। বর্তমানে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও পর্যটক এক্সপ্রেস এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে প্রবাল ও সৈকত ট্রেন চলাচল করছে। ঢাকা-কক্সবাজারের দুটি আন্তনগর ট্রেন মূলত বিরতিহীনভাবে চলাচল করে, শুধু চট্টগ্রাম জংশনে যাত্রাবিরতি রয়েছে।
রেলওয়ের বাণিজ্যিক বিভাগ সূত্র জানায়, ঢাকা-কক্সবাজার রুটে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১১ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। বর্তমানে আসনসংখ্যার তুলনায় টিকিটের চাহিদাও বেশি। রুট সম্প্রসারণ হলে যাত্রীদের জন্য নতুন সুবিধা তৈরি হবে বলে মনে করছেন নিয়মিত যাত্রীরা।
কক্সবাজারের একটি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা ও এই রুটের নিয়মিত যাত্রী আবদুল কাইয়ুম বলেন, তিনি নিয়মিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে যাতায়াত করেন। বর্তমানে এই রুটে চলাচলকারী দুটি ট্রেনেই নন-এসি কোচ রয়েছে। মহানগর এক্সপ্রেস কক্সবাজার পর্যন্ত চলাচল শুরু করলে এসি কেবিন ও এসি কোচে যাতায়াতের সুযোগ পাওয়া যাবে। এতে যাত্রীদের ভ্রমণ আরও আরামদায়ক হবে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের উপপ্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ বলেন, ঢাকা-কক্সবাজার রুটটি রেলওয়ের জন্য লাভজনক। বর্তমানে চলাচলকারী ট্রেনগুলোর আসন পূর্ণ থাকে এবং এ রুটে আরও টিকিটের চাহিদা রয়েছে। মহানগর এক্সপ্রেসের রুট বাড়ানো হলে একদিকে যাত্রীদের সুবিধা বাড়বে, অন্যদিকে রেলওয়ের রাজস্বও বাড়বে।
রুট সম্প্রসারণের প্রস্তুতি চলছে জানিয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (সিওপিএস) শফিকুর রহমান বলেন, কক্সবাজার পর্যন্ত মহানগর এক্সপ্রেস চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, রুট সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে কক্সবাজারে ট্রেনের ওয়াশ ও সার্ভিসিং সুবিধা গড়ে তোলা হচ্ছে। বর্তমানে সেখানে দৈনিক ওয়াশিংয়ের জন্য অস্থায়ী ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সাপ্তাহিক ওয়াশ ও সার্ভিসিংয়ের জন্য নতুন অবকাঠামো প্রয়োজন হবে। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী সাদেকুর রহমান বলেন, কক্সবাজারে মহানগর এক্সপ্রেসের ওয়াশিং অবকাঠামো তৈরির জন্য সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল বরাদ্দের বিষয়েও কাজ চলছে।
তবে রুট সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে রেক ও ইঞ্জিনের সংকট। পরিবহন বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, মহানগর এক্সপ্রেস বর্তমানে একটি রেক দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচল করে। কক্সবাজার পর্যন্ত রুট বাড়াতে হলে দুটি রেক প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘ রুটের সময়সূচি ঠিক রাখতে উচ্চগতিতে চলতে সক্ষম ইঞ্জিনও প্রয়োজন। রেলওয়ের বহরে এ ধরনের ইঞ্জিনের স্বল্পতা থাকায় নির্ধারিত সময়ে ট্রেন চালানোই বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের বহরে উচ্চগতিতে চলতে সক্ষম ৩ হাজার সিরিজের ৩০টি ইঞ্জিন রয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি ইঞ্জিন আনফিট। ফলে নিয়মিত চলাচলের জন্য কার্যকর রয়েছে মাত্র ১১টি ইঞ্জিন।
পরিবহন বিভাগের ওই কর্মকর্তা বলেন, ৩ হাজার সিরিজের কিছু ইঞ্জিন উচ্চগতিতে চলার সক্ষমতা রাখলেও অনেক ইঞ্জিনে পর্যাপ্ত ট্র্যাকশন মোটর নেই। এ কারণে সেগুলো নির্ধারিত গতিতে চলতে পারে না। আবার যেসব ইঞ্জিনে পর্যাপ্ত ট্র্যাকশন মোটর রয়েছে, সেগুলো বর্তমানে বিরতিহীন ট্রেন পরিচালনায় ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে মহানগর এক্সপ্রেস কক্সবাজার পর্যন্ত চালু করতে একটি পুরোপুরি ফিট ও উপযুক্ত ইঞ্জিনের ব্যবস্থা করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
যান্ত্রিক বিভাগ সূত্র জানায়, ট্রেনের ট্র্যাকশন মোটর বৈদ্যুতিক শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তর করে চাকার ঘূর্ণন সৃষ্টি করে। ট্রেনকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কার্যকর ট্র্যাকশন মোটর না থাকলে ইঞ্জিনের কাঙ্ক্ষিত গতি ও সক্ষমতা পাওয়া সম্ভব হয় না।
সব প্রস্তুতি ও কারিগরি সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজারের সঙ্গে দেশের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জেলার সরাসরি রেল যোগাযোগ তৈরি হবে। এতে পর্যটকদের পাশাপাশি ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও নিয়মিত যাত্রীদের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি রেলওয়ের আয়ও বাড়তে পারে।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর