কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ি সাধারণ কোনো বালুর স্তূপ নয়। ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাত ঠেকানো, উপকূলীয় ক্ষয় কমানো এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি মোকাবিলায় এগুলো প্রকৃতির তৈরি এক ধরনের প্রতিরক্ষা দেয়াল। বালিয়াড়ির সঙ্গে থাকা সাগরলতা ও অন্যান্য উপকূলীয় উদ্ভিদ বালু আটকে রেখে এই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্ত করে।
সেই বালিয়াড়িই এখন গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে কক্সবাজার শহরের সুগন্ধা পয়েন্টে। সমুদ্রসৈকতের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএর ভেতরে সৈকত ভরাট করে নির্মাণ করা হচ্ছে দীর্ঘ একটি সড়ক। এর জন্য কেটে ফেলা হচ্ছে সাগরলতা, নষ্ট হচ্ছে লাল কাঁকড়ার আবাসস্থল। ধ্বংস করা হচ্ছে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি একাধিক বালুর ডেইল।
পরিবেশবিদদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে আরেকটি বিষয়। তাদের ভাষ্য, সৈকতের এই অংশের পাশেই সড়ক নির্মাণের জন্য বিকল্প জায়গা রয়েছে। তারপরও সৈকতের বালিয়াড়ি ও ডেইল কেটে সড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার পৌরসভা অবশ্য বলছে, সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্যবর্ধন, ভাঙনকবলিত এলাকা রক্ষা এবং পর্যটকদের সুবিধার জন্যই সড়কটি নির্মাণ করা হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সৈকতের বিস্তীর্ণ অংশে বালু ফেলে জায়গা উঁচু ও সমতল করা হচ্ছে। সেই ভরাট অংশের ওপর দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে সড়ক। সড়কের জায়গা তৈরি করতে কোথাও কোথাও কেটে ফেলা হয়েছে বালিয়াড়ি। মাটির সঙ্গে উপড়ে ফেলা হয়েছে সাগরলতার ঝোপ। সৈকতের এই অংশে থাকা বালুর ডেইলগুলোও একে একে সমতল করে দেওয়া হচ্ছে। এসব ডেইলের আশপাশে আগে সাগরলতা ও অন্যান্য উপকূলীয় উদ্ভিদের উপস্থিতি ছিল। ছিল লাল কাঁকড়ার বিচরণও।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শ্রমিক বলেন, তারা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্সের (এনডিই) পক্ষে কাজ করছেন।
কক্সবাজার সৈকতের বালিয়াড়ি ধ্বংসের বিষয়টি পরিবেশবিদদের কাছে বিশেষভাবে উদ্বেগের। কারণ, উপকূলীয় ক্ষয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বালিয়াড়িকে প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। কক্সবাজারেও এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সমুদ্রসৈকতের ভাঙন রোধ এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে বালুর ডেইল তৈরিতে কাজ করে। অর্থাৎ যে বালিয়াড়ি তৈরিতে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলার কথা মাথায় রেখে অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল, কয়েক বছর পর সেই ডেইলেরই একটি অংশ সড়ক নির্মাণের জন্য সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
কক্সবাজারভিত্তিক পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) চেয়ারম্যান মুজিবুল হক বলেন, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র ও নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় ক্ষয় মোকাবিলায় প্রাকৃতিকভাবে বালিয়াড়ি তৈরিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কক্সবাজারেও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে সমুদ্রসৈকতের ভাঙন রোধ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে ডেইল তৈরি করা হয়েছিল। অথচ পাশেই বিকল্প জায়গা থাকার পরও সড়ক নির্মাণের নামে সেই ডেইল ধ্বংস করা হচ্ছে।
মুজিবুল হকের ভাষ্য, দাতা দেশগুলো বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নেবে না। নির্মাণকাজ শিগগির বন্ধ করা প্রয়োজন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী দেশের ১৩টি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার একটি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। ইসিএ এলাকায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করে এমন স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ, মাটি-পানি-বায়ুর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন বা নষ্ট করতে পারে এমন কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ। তারপরও এই ইসিএ এলাকায় চলছে সড়ক নির্মাণের কাজ।
ইসিএ এলাকায় সড়ক নির্মাণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে কি না, জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনডিইর প্রকল্প ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহীন মিয়া বলেন, পরিবেশের ছাড়পত্র নেওয়ার বিষয়টি কক্সবাজার পৌরসভা বলতে পারবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা গণমাধ্যমে বলেন, সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে সড়ক নির্মাণের বিষয়টি তারা শুনেছেন। বিষয়টি সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দিতে একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা। এখানে কোনো ধরনের কাজ করতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র প্রয়োজন। কিন্তু সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কোনো ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি।
কক্সবাজার পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে হোটেল সায়মন পর্যন্ত উপকূলীয় এই সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের নাম ‘নগর উন্নয়ন ও নগর শাসন প্রকল্প’। সড়কটির দৈর্ঘ্য ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ২৮ মিটার। ২০২৫ সালের ১৭ জুন নির্মাণকাজের দরপত্র প্রস্তাব আহ্বান করা হয়। পরে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকায় কাজটি পায় ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই)। প্রকল্পটির অর্থায়ন করছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) এবং বাস্তবায়ন করছে কক্সবাজার পৌরসভা। ২০২৭ সালের ৫ অক্টোবর নির্মাণকাজ শেষ করার কথা রয়েছে।
কক্সবাজার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রুমেল বড়ুয়া গণমাধ্যমে বলেন, সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্যবর্ধন, ভাঙনকবলিত এলাকা রক্ষা এবং পর্যটকদের সুবিধার জন্য সড়কটি নির্মাণ করা হচ্ছে।
সৈকতে স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে কক্সবাজারের জন্য রয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও পরিকল্পনাগত বাধা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, কক্সবাজার সৈকতে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ না করা এবং স্থায়ী-অস্থায়ী সব স্থাপনা ভেঙে ফেলার বিষয়ে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এ ছাড়া ২০১৩ সালে সরকার কক্সবাজারের জন্য একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে। সেই মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, কক্সবাজার পৌরসভা এলাকার জোয়ার-ভাটার মধ্যবর্তী রেখা থেকে সৈকতসংলগ্ন প্রথম ৩০০ মিটার এলাকা ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সেখানে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই।
নজরুল ইসলাম বলেন, এর পরও সৈকতের বালিয়াড়ি দখল করে সড়ক নির্মাণ দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। এ কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানাই।
কক্সবাজারের সৈকতকে রক্ষা করার প্রশ্নটি এখন শুধু সৌন্দর্য কিংবা পর্যটনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও উপকূলীয় ক্ষয়ের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। এই বাস্তবতায় উপকূলের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বালিয়াড়ি ও উপকূলীয় উদ্ভিদ সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থারই অংশ। সাগরলতার শিকড় বালু আটকে রাখে। বালিয়াড়ি ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাসের শক্তি কমাতে ভূমিকা রাখে। এসবের ওপর নির্ভর করে উপকূলের নানা প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থলও গড়ে ওঠে। ফলে একটি সড়ক নির্মাণের জন্য বালিয়াড়ি সরিয়ে ফেলার প্রভাব শুধু ওই কয়েক শ মিটার জায়গায় সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। প্রাকৃতিকভাবে তৈরি সৈকতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হলে ভবিষ্যতে ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাতে ক্ষয় আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।
তাদের মতে, কক্সবাজারের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা করার সময় সেই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ, প্রকৃতির তৈরি যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একবার নষ্ট হয়ে যায়, কোটি টাকা খরচ করেও তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সহজ নয়।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর