• ঢাকা
  • ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ১০ সেকেন্ড পূর্বে
শাহীন মাহমুদ রাসেল
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২০ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:১৭ রাত

নাছির পাড়ায় ফিরল পঁচিশ বছর আগের ছেলেটি

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার হলদিয়াপালং ইউনিয়নের নাছির পাড়া। ছোট্ট একটা গ্রাম, যেখানে পঁচিশ বছর ধরে একটা উঠোন প্রতিদিন সূর্য দেখেছে, কিন্তু দেখেনি তার সবচেয়ে বড় ছেলেকে। সেই ছেলেটির নাম মোহাম্মদ ফরিদ। দশ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে যে জাহাজে চড়ে গ্রাম ছেড়েছিল, সেই ছেলেটিকে গ্রাম আর কখনো ফিরতে দেখেনি এতদিন।

প্রায় দশ বছর বয়সে বাবা মো. আয়ুব আলীর সঙ্গে জাহাজে চড়ে পাকিস্তানে পাড়ি জমায় ফরিদ। শৈশবের চোখে তখন হয়তো ছিল বিদেশের হাতছানি, ভিনদেশের রোমাঞ্চ। কিন্তু নাছির পাড়ার সেই ছেলেটি জানত না, এই যাত্রাই তাকে ছুঁড়ে ফেলবে পঁচিশ বছরের এক দুর্বিষহ বাস্তবতায়।

পাকিস্তানে কোনো একসময় তার দুই পা কেটে ফেলতে হয়- ঠিক কী পরিস্থিতিতে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। প্রায় এক দশক পাকিস্তানে কাটানোর পর দালালেরা তাকে সড়কপথে নিয়ে যায় তুরস্কে। যে ছেলেটি একদিন দৌড়ে বেড়াত নাছির পাড়ার মাটিতে, সে তখন পা ছাড়াই বেঁচে থাকার লড়াই করছে অচেনা এক দেশে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২৫ বছর আগে ফরিদ তার বাবার সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যান। পরে তারা পাকিস্তানে পৌঁছান। সেখানে কাজ করার সময় চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন ফরিদ। এই ঘটনায় তার দুই পা কেটে ফেলতে হয়।

এরপর এক মানবপাচারকারী তাকে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখায়। পাকিস্তান থেকে ইরান হয়ে তিনি তুরস্কে পৌঁছান। কিন্তু ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তুরস্কের সমুদ্রতীরে পানি বিক্রি করে প্রায় ১৪ বছর কাটান। সেখানে অনিয়মিত অভিবাসী হিসেবে বসবাসের সময় তুরস্কের পুলিশ তাকে তিনবার আটক করে ক্যাম্পে রাখে। সর্বশেষ গ্রেফতারের পর তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

বুধবার (১৯ আগস্ট) ভোর সোয়া পাঁচটা। টার্কিশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট নামে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। যাত্রীদের মধ্যে ছিলেন মোহাম্মদ ফরিদ- শরীরে পঁচিশ বছরের প্রবাসজীবনের চিহ্ন, মুখে ভুলে যাওয়া মাতৃভাষা।

দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার কারণে ফরিদ আর স্বাভাবিকভাবে বাংলা বলতে পারছিলেন না। তার কাছে ছিল কেবল নিজের নাম, বাবা-মায়ের নাম, আর শৈশবের কিছু বিচ্ছিন্ন, অস্পষ্ট স্মৃতি- নাছির পাড়ার সেই ছেলেটির শেষ চিহ্ন হয়ে।

বিমানবন্দর থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আশকোনায়, ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে। সেখানে শুরু হয় প্রশ্ন একটাই- এই ছেলেটির গ্রাম কোথায়?

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, ফরিদের পরিবারের সন্ধান করাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সীমিত তথ্য, ভাঙা বাংলা— তবু থেমে থাকেনি অনুসন্ধান।

সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয় ফরিদের ছবি ও তথ্য। কক্সবাজারের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ব্র্যাকের কর্মীরা। বিভিন্ন এলাকায় লাগানো হয় পোস্টার। স্থানীয় মানুষ, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি- সবাই মিলে গড়ে ওঠে এক অনানুষ্ঠানিক খোঁজ-নেটওয়ার্ক।

বিকেলের মধ্যেই মেলে নির্দিষ্ট তথ্য- উখিয়ার নাছির পাড়া। বাড়িতে গিয়ে নিশ্চিত করা হয় পরিচয়। মাত্র বারো ঘণ্টার অনুসন্ধানে শেষ হয় পঁচিশ বছরের এক প্রশ্নচিহ্ন।

নাছির পাড়ায় খবর পৌঁছাতেই স্তব্ধ হয়ে যান পরিবারের সদস্যরা। ছোট ভাই সৈয়দ আলম বলেন, আমরা ধরে নিয়েছিলাম, ফরিদ আর বেঁচে নেই। কিন্তু এত বছর পর তাকে ফিরে পেয়ে আমরা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।

বুধবার বিকেলে ভিডিও কলে ফরিদের সঙ্গে কথা হয় সৈয়দ আলমের। পঁচিশ বছর পর ভাইয়ের কণ্ঠ শুনে আবেগে ভেঙে পড়ে পরিবার। আর তারপর মেলে চূড়ান্ত প্রমাণ- ফরিদের হাতে ছয়টি আঙুল। শৈশবের এই চিহ্নই মুছে দেয় শেষ সংশয়টুকু। নাছির পাড়ার সেই ছেলেটিই ফিরেছে, নিশ্চিত।

বৃহস্পতিবার আশকোনার ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় ফরিদকে। পরিবারের সন্ধান মেলার পর ছোট ভাই সৈয়দ আলমকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়, যাতে পঁচিশ বছর পর দুই ভাইয়ের সরাসরি দেখা হতে পারে।

শরিফুল হাসান বলেন, পঁচিশ বছর পর একজন মা তার ছেলেকে ফিরে পাবেন, একজন ভাই ফিরে পাবেন তার ভাইকে- এর চেয়ে আনন্দের মুহূর্ত তাদের জন্য আর কিছু হতে পারে না।

ব্র্যাক জানায়, গত আট বছরে বিমানবন্দরে ৪১ হাজার প্রবাসীকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে, এর মধ্যে ফরিদের মতো ১৬৪ জনকে নিরাপদে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে পরিবারের কাছে।

তবে নাছির পাড়ায় এখনো একজনের অপেক্ষা শেষ হয়নি পুরোপুরি। ফরিদের বাবা আয়ুব আলী এখনো রয়ে গেছেন পাকিস্তানে। আর গ্রামের সেই বৃদ্ধা মা নূরজাহান বেগম- যিনি পঁচিশ বছর ধরে বিশ্বাস করে এসেছেন তার ছেলে বেঁচে আছে- তার অপেক্ষা এবার সত্যিই শেষের পথে।

দুই পা নেই, মাতৃভাষা প্রায় ভুলে গেছেন, তবু নাছির পাড়ার মাটির টান ভোলেননি মোহাম্মদ ফরিদ। জাহাজে চড়ে যে ছেলেটি একদিন গ্রাম ছেড়েছিল, পঁচিশ বছর পর সে ফিরল- বদলে যাওয়া শরীরে, কিন্তু অটুট এক পরিচয় নিয়ে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কিছু গল্পের শেষ থাকে না নির্দিষ্ট মেয়াদে। তারা শুধু অপেক্ষা করে, যতদিন না বাড়ি ফেরার পথটা আবার খুঁজে পাওয়া যায়।

বাপ্পি/সা.এ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:

BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ [email protected]
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ [email protected]