কেউ পরেছেন সাদা কাফনের কাপড়, কেউ হাতে তুলে নিয়েছেন সঞ্চয়ের হিসাবের কাগজ। কারও চোখেমুখে ক্ষোভ, কারও কণ্ঠে অসহায়ত্ব। জীবনের কষ্টার্জিত সঞ্চয় ফেরত পাওয়ার দাবিতে শনিবার বিকেলে কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালী স্টেশন চত্বরে জড়ো হয়েছিলেন শত শত নারী-পুরুষ।
তাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর বিশ্বাস করে যে আউটলেটে টাকা জমিয়েছেন, প্রয়োজনের সময় সেই টাকা তুলতে গিয়ে জানতে পারছেন, হিসাবের খাতায় নেই জমা করা অর্থের বড় অংশ। কারও লাখ লাখ টাকার সঞ্চয়ের বিপরীতে হিসাবে মিলছে কয়েক হাজার টাকা, আবার কারও হিসাবে দেখা যাচ্ছে মাত্র কয়েক শ টাকা।
প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে তাই সাদা কাফনের কাপড় বেছে নিয়েছেন অনেকে। তাদের ভাষ্য, জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে তারা যেন ‘জীবিত থেকেও মৃত’।
শনিবার (২২ আগস্ট) বিকেলে পালংখালী স্টেশন চত্বরে আয়োজিত মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশে এ চিত্র দেখা যায়। কর্মসূচিতে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের পাশাপাশি স্থানীয় নারী-পুরুষও অংশ নেন।
মামলার বাদী ও আউটলেটটির গ্রাহক আনোয়ার ফয়সাল আরিফ বলেন, তার হিসাবে ৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকা জমা ছিল। কিন্তু টাকা তুলতে গিয়ে জানতে পারেন, হিসাবে ওই অর্থ নেই। তার মতোই বিপাকে পড়েছেন আরও বহু গ্রাহক।
গ্রাহক মোহাম্মদ সোলাইমান বলেন, বিশ্বাস করে তিনি ওই আউটলেটে ৬ লাখ টাকা জমা রেখেছিলেন। হিসাব যাচাই করে দেখেন, তার অ্যাকাউন্টে রয়েছে মাত্র ৪ হাজার ৪৮০ টাকা।
আবুল মঞ্জুরের দাবি, তার হিসাবে ৪ লাখ টাকা জমা ছিল। অথচ এখন সেখানে দেখানো হচ্ছে মাত্র ৪০০ টাকা। আব্দুল কাদের জানান, তার হিসাবে সাড়ে ৫ লাখ টাকা জমা থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে মাত্র ১ হাজার টাকা।
গ্রাহক নুরুল বশরের অভিযোগও একই ধরনের। তিনি সাড়ে ৭ লাখ টাকা জমা রেখেছিলেন। টাকা তুলতে গিয়ে জানতে পারেন, হিসাবে রয়েছে মাত্র ৩ হাজার টাকা।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে একই অভিযোগ, তারা নিয়মিত টাকা জমা দিয়েছেন, কিন্তু প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে গেলে নানা অজুহাতে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে হিসাব যাচাই করতে গিয়ে জমা ও হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি দেখতে পান।
মানববন্ধনে আমিরুল ফয়েজ জানান, দীর্ঘদিন ধরে তিনি ওই আউটলেটে টাকা জমা করেছেন। প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে গেলে নানা অজুহাতে তাকে ফেরত দেওয়া হয়েছে। পরে হিসাব মিলিয়ে জমা করা অর্থের সঙ্গে হিসাবে থাকা টাকার মিল পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, আমরা কারও দয়া চাই না। আমরা আমাদের কষ্টার্জিত টাকা ফেরত চাই। সঠিক তদন্ত করে প্রত্যেক গ্রাহকের হিসাব অনুযায়ী টাকা ফেরত দিতে হবে।
কুলসুম নাহারের অভিযোগ, বিশ্বাস করেই তিনি ওই আউটলেটে টাকা রেখেছিলেন। এখন প্রয়োজনের সময় জানতে পারছেন, হিসাবে পুরো টাকা নেই।
তার দাবি, প্রতিটি গ্রাহকের হিসাব পুনরায় যাচাই করে প্রকৃত জমার পরিমাণ নির্ধারণ এবং সেই অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ, পালংখালী বাজারে অবস্থিত আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট আউটলেটটির মাধ্যমে প্রায় ১৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ঘটনায় আউটলেটের মালিক হাকিম উদ্দিন (৬৮) ও ক্যাশিয়ার তাহসিন ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে উখিয়া থানা-পুলিশ। পরে তাদের আদালতে পাঠানো হয়।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে পালংখালী বাজারের ইয়াকুব-মোস্তফা মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় আউটলেটটির কার্যক্রম শুরু হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আউটলেটটির মালিক ও কর্মীদের পূর্বপরিচয় থাকায় এলাকার অনেক মানুষ সেখানে হিসাব খুলে নিয়মিত লেনদেন করতেন।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, আউটলেটটির মালিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা পরস্পরের যোগসাজশে হিসাবের বই, জমার রসিদ ও অন্যান্য নথিতে জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাহকদের জমা করা অর্থ অন্য হিসাবে স্থানান্তর করে আত্মসাৎ করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো হিসাবে লাখ লাখ টাকা জমা থাকার পরও পরে সেই হিসাবে মাত্র ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।
এজাহার অনুযায়ী, গত ১৮ আগস্ট গ্রাহকেরা তাদের জমা রাখা ১ কোটি ৪২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৪৪ টাকা ফেরত দাবি করতে আউটলেটে যান। সেখানে বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে আউটলেটের মালিক হাকিম উদ্দিন ও ক্যাশিয়ার তাহসিন ইসলামকে তারা আটক করেন। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দুজনকে হেফাজতে নেয়।
এরপর আনোয়ার ফয়সাল আরিফ বাদী হয়ে উখিয়া থানায় মামলা করেন। মামলায় আউটলেটের মালিক হাকিম উদ্দিন, ক্যাশিয়ার তাহসিন ইসলাম, ম্যানেজার হাবিব উল্লাহ ফরহাদ, অংশীদার মালিক বেলাল উদ্দিনসহ মোট নয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও পাঁচ থেকে ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, গ্রাহকদের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে দুজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পালংখালীর এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে গ্রাহকদের কাফনের কাপড় পরে মানববন্ধনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি। কারণ, যারা বছরের পর বছর অল্প অল্প করে টাকা জমিয়েছেন, তাদের অনেকের কাছে এই অর্থ শুধু ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা নয়। কারও সন্তানের পড়াশোনার টাকা, কারও মেয়ের বিয়ের সঞ্চয়, কারও জীবনের শেষ সম্বল। সেই সঞ্চয় এখন হিসাবে নেই বলে অভিযোগ ওঠায় তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে তাদের কাছে এই অর্থের সংকট মৃত্যুর শোকের মতোই ভারী। ভুক্তভোগীদের দাবি, কার কার হিসাবে কত টাকা জমা ছিল, কত টাকা উত্তোলন করা হয়েছে এবং বর্তমানে কত টাকা থাকার কথা, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক। একই সঙ্গে তাদের জমাকৃত অর্থ দ্রুত ফেরত দেওয়া এবং অভিযোগের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা হোক।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আউটলেটটির ম্যানেজার হাবিব উল্লাহ ফরহাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর