বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া হিন্দু, শিখ ও জৈন শরণার্থীদের আগামী ছয় মাসের মধ্যে নাগরিকত্ব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এ প্রক্রিয়া দ্রুত করতে পশ্চিমবঙ্গের আট জেলার জেলা প্রশাসকদের বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে অবৈধভাবে বসবাসকারী অভিবাসীদের শনাক্ত করে দেশ থেকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন তিনি।
শনিবার (২২ আগস্ট) পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে ভারতের তিনটি নতুন ফৌজদারি আইন নিয়ে আয়োজিত এক প্রদর্শনীতে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন অমিত শাহ। তিনি জানান, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ)-এর আওতায় নাগরিকত্বের আবেদন প্রক্রিয়াকরণ ও চূড়ান্ত করার জন্য পশ্চিমবঙ্গের আট জেলার জেলা প্রশাসকদের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
অমিত শাহ বলেন, বাংলাদেশ থেকে বাধ্য হয়ে ভারতে আসা হিন্দু, শিখ ও জৈন শরণার্থীদের মর্যাদার সঙ্গে ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। তাঁর দাবি, আগামী ছয় মাসের মধ্যেই এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
সিএএতে কারা নাগরিকত্বের সুযোগ পাবেন
ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) অনুযায়ী, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে যাওয়া নির্দিষ্ট ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আইনের আওতায় হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের যেসব মানুষ ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে ওই তিন দেশ থেকে ভারতে এসেছেন এবং ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর বা তার আগে দেশটিতে প্রবেশ করেছেন, তারা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারেন।
তবে সিএএ নিয়ে ভারতে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। মুসলিম সম্প্রদায়কে আইনের আওতায় না রাখার বিষয়টি নিয়ে বিরোধী দল ও বিভিন্ন সংগঠন আপত্তি জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে বিজেপি সরকারের দাবি, প্রতিবেশী তিন দেশে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার লক্ষ্যেই আইনটি করা হয়েছে।
অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা
শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার ঘোষণার পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধেও সরকারের কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন অমিত শাহ। তিনি বলেন, সরকার অবৈধ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’—অর্থাৎ শনাক্ত করা, তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এবং দেশ থেকে ফেরত পাঠানোর নীতি অনুসরণ করবে।
পশ্চিমবঙ্গের জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রতিটি অনুপ্রবেশকারীকে শনাক্ত করে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বের করে দেওয়া হবে।
অমিত শাহের এই বক্তব্যের ফলে পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে স্পর্শকাতর ইস্যু
বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত থাকায় পশ্চিমবঙ্গে সীমান্ত পারাপার ও অভিবাসন বহু বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু। বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ অভিবাসন ঠেকানো এবং সিএএ বাস্তবায়নকে তাদের রাজনৈতিক প্রচারের অন্যতম বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছে।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বিরোধীরা বিভিন্ন সময়ে সিএএর বিরোধিতা করেছেন। শিলিগুড়ির বক্তব্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করে অমিত শাহ বলেন, তিনি সিএএ গ্রহণ করেননি, তবে এখন বিজেপির সরকার রয়েছে।
আট জেলা প্রশাসক পেলেন বিশেষ ক্ষমতা
সিএএর অধীনে নাগরিকত্বের আবেদন দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ ও চূড়ান্ত করার জন্য পশ্চিমবঙ্গের আট জেলার জেলা প্রশাসকদের বিশেষ ক্ষমতা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন অমিত শাহ। এর ফলে যোগ্য আবেদনকারীদের নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হতে পারে।
বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া হিন্দু, শিখ ও জৈন সম্প্রদায়ের যেসব মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বসবাস করছেন, তাদের মধ্যে নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রত্যাশা বাড়তে পারে। তবে নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনের নির্ধারিত শর্ত, আবেদনকারীর যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
অমিত শাহের বক্তব্যে একই সঙ্গে দুটি নীতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে—সিএএর আওতায় যোগ্য শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। পশ্চিমবঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও অভিবাসন নিয়ে চলমান রাজনৈতিক বিতর্কে এই ঘোষণা নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
তিন নতুন ফৌজদারি আইন নিয়ে প্রদর্শনী
শিলিগুড়িতে ভারতের তিনটি নতুন ফৌজদারি আইন নিয়ে আয়োজিত প্রদর্শনীতে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব মন্তব্য করেন অমিত শাহ। নতুন আইন তিনটি হলো—
* ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস)
* ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (বিএনএসএস)
* ভারতীয় সাক্ষ্য অধিনিয়ম (বিএসএ)
পুরোনো ভারতীয় দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি ও ভারতীয় সাক্ষ্য আইনের পরিবর্তে এসব আইন কার্যকর করেছে ভারত সরকার।
প্রদর্শনীতে নতুন ফৌজদারি আইনগুলোর বিভিন্ন দিক তুলে ধরার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন ইস্যুতেও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। যোগ্য শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা রাজ্যটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ তৈরি করতে পারে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর