বরগুনার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের, সভা-সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক, সংগীতচর্চা ও নানা সামাজিক আয়োজনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্নে বরগুনা পৌর শহরের সিরাজউদ্দীন সড়কে নির্মাণ করা হয়েছিল প্রায় ৫০০ আসনের পৌর অডিটরিয়াম মিলনায়তন (টাউনহল)। কিন্তু নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বন্ধ করে দেওয়ায় বছরের পর বছর ধরে পড়ে আছে ভবনটি।
মানুষের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হওয়ার বদলে অসম্পূর্ণ এই মিলনায়তন এখন পরিণত হয়েছে গোয়ালঘর ও মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে। বরগুনা পৌরসভা সূত্রে জানাগেছে, ২০১৮ সালের মার্চ মাসে টাউন হল নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭ কোটি ২ লাখ টাকা। চুক্তি অনুযায়ী ২০২০ সালের মার্চে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। পরে ২০২২ সালের দিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভবনের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন চলে যায়।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকা ভবনটির এখন কোনো কার্যকর ব্যবহার নেই। নির্মাণাধীন ভবনের দরজা-জানালাসহ বিভিন্ন অংশ খুলে নিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় দুর্বৃত্তরা । রক্ষণাবেক্ষণেরও তেমন কোনো উদ্যোগ নেই পৌর কর্তৃপক্ষের। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সম্ভাবনাময় স্থাপনা ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয়দের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, অসম্পূর্ণ ও অরক্ষিত ভবনটির বিভিন্ন অংশ এখন গরু-ছাগল রাখার খোয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মানুষের নিয়মিত যাতায়াত না থাকায় জায়গাটি অনেকটা নির্জন হয়ে পড়েছে। সেই সুযোগে মাদকসেবীদেরও এখানে নিয়মিত আড্ডা চলে। দিনের বিভিন্ন সময়ে স্কুল ফাঁকি দেওয়া শিক্ষার্থীদের সেখানে বসে আড্ডা দিতে দেখা যায় বলেও স্থানীয়দের দাবি। ফলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য নির্মাণাধীন একটি ভবন এখন উল্টো অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডের জায়গা হয়ে উঠছে। বরগুনার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষের কাছে টাউন হলটি ছিল দীর্ঘদিনের একটি দাবি।
খেলাঘর বরগুনা জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. রাসেল মাহমুদ বলেন, সাংস্কৃতিক চর্চা ও বিকাশের উদ্দেশ্যেই টাউন হল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এখানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের জন্য আলাদা কক্ষ দেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু কাজ শেষ না হওয়ায় সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও সাংস্কৃতিক সংগঠন কিংবা পৌরবাসী এর কোনো সুবিধা পাচ্ছেন না।
জেলা শ্রমিক আন্দোলনের সাবেক সভাপতি গোলাম হায়দার স্বপন বলেন, টাউন হলটি পুরোপুরি নির্মাণ করা সম্ভব হলে রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সভা-সমাবেশ এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন অনেক সহজ হতো। তাঁর অভিযোগ, সাবেক পৌর মেয়র মো. শাহাদাত হোসেনের সময়ে কাজ শুরু হলেও ২০২২ সালে নির্বাচিত মেয়র অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান মহারাজের সময় রাজনৈতিক বিরোধের কারণে প্রকল্পটির কাজ আর শেষ হয়নি।
তিনি আরো বলেন, কাজ শেষ না হওয়ায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি এখন গরু-ছাগলের খোয়ারে পরিণত হয়েছে।
সুর সাকী সংঙ্গীত একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার শাহিন বলেন, টাউন হলের ভবনের বড় একটি অংশ নির্মাণ করা হলেও অসম্পূর্ণ কাজের কারণে সেটি যে উদ্দেশ্যে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সেটা ব্যহত হয়েছে।
এ অবস্থায় ভবনটি যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি এর আশপাশের পরিবেশও দিন দিন অনিরাপদ হয়ে উঠছে। বরগুনার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এই টাউনহলটি অনেক গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা রাখতে পারতো। দ্রুত এর নির্মাণকাজ শেষ করে সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য উম্মুক্ত করার দাবী করছি। তবে কাজ বন্ধ হওয়ার বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রকল্পের বরাদ্দের অর্থ অন্য খাতে ব্যয় হয়ে যাওয়ার কারনে নির্মাণকাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন তারা।
আরিফ অ্যান্ড আসিফ কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী মো. আবুল হোসেন খান বলেন, ভবন নির্মাণের কাজ যখন শেষের দিকে, তখন প্রকল্পের বরাদ্দ করা অর্থ তৎকালীন পৌর মেয়র অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান মহারাজ পৌরসভার প্রকৌশলীদের যোগসাজশে অন্য খাতে ব্যয় করে ফেলেন। ফলে তাঁরা অর্থ না পাওয়ায় কাজ চালিয়ে যেতে পারেননি।
আবুল হোসেন খান আরো জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠান প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ করেছে। প্রকল্পের নির্ধারিত তহবিলে টাকা জমা দেওয়া হলে তাঁরা বাকি কাজ শেষ করতে প্রস্তুত রয়েছেন। প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা হলেই অসম্পূর্ণ ভবনের কাজ আবার শুরু করা সম্ভব।
বরগুনা পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাছুম বিল্লাহ্ বলেন, নির্মাণকাজ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। এরপরও তারা কাজ শেষ করেনি। ইতোমধ্যে ঠিকাদার প্রায় চার কোটি টাকা বিল নিয়েছেন বলেও জানান তিনি। কাজ শুরু হলে প্রশাসক অথবা মেয়র প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থের ব্যবস্থা করে দেবেন।
এ বিষয়ে বরগুনা পৌর প্রশাসক সজল চন্দ্র শীল বলেন, পৌর মিলনায়তনের সম্পূর্ণ কাজ শেষ না করেই ঠিকাদার কাজ ছেড়ে চলে যান। আমরা একাধিকবার ঠিকাদারকে অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার জন্য তাগিদ দিয়েছি।
কিন্তু এরপরও তারা বাকি কাজ শুরু করেনি। টাউন হল নির্মাণের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ অন্যত্র ব্যয় করা হয়েছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এখানে যোগদানের আগে কী হয়েছে, সে বিষয়ে আমি অবগত নই। পৌরসভার পুরোনো যেসব কর্মকর্তা রয়েছেন, তারা এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবেন।’
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর