নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১৬০ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। বন্যায় নেপালের উত্তরাঞ্চলের রাস্তা, সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সূত্র: আলজাজিরা, এএফপি, এপি ও রয়টার্স।
বুধবার (২৬ আগস্ট) নেপালের পার্বত্য জেলা রাসুয়ায় আকস্মিক বন্যার পানি নেমে এসে গ্রাম ও বিভিন্ন স্থাপনা ভাসিয়ে নেয়। নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১৫৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্গত এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নিখোঁজদের উদ্ধারে অভিযান চলছে।
নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যার পর দেশটিতে ৪০৩ জন পর্যটকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতের নাগরিক। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকও রয়েছেন।
নেপাল পুলিশের মুখপাত্র অভি নারায়ণ কাফলে জানিয়েছেন, ২৮ জন পুলিশ সদস্যও নিখোঁজ রয়েছেন।
সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে অন্তত তিনজন নিহত এবং আরও ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা এখনো যাচাই করা হচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, নেপাল-চীন সীমান্তের গিরং বন্দরে ভূমিধসে সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি দ্বিতীয় দফা দুর্যোগ ঠেকাতে পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ দুর্যোগ মোকাবিলায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, উদ্ধার, চিকিৎসা, খাবার ও আশ্রয়ের জন্য সরকার প্রয়োজনীয় সব দায়িত্ব নেবে।
দুর্গত রাসুয়ার সিয়াপ্রু বেসি ও তিমুরে পানির উচ্চতা এত বেশি ছিল যে হেলিকপ্টার অবতরণ করতে পারেনি। জেলা প্রশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার ভোতে কোশি নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের উঁচু এলাকায় সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নদীর পানিতে কয়েকটি গ্রাম ও অবকাঠামো প্রকল্পের এলাকা ভেসে গেছে।
নেপাল সরকারের মুখপাত্র সাসমিত পোখরেল জানিয়েছেন, উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তার জন্য ভারত ও চীনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। নেপাল সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে হেলিকপ্টার ও দুর্যোগ মোকাবিলা দলের সদস্যদের দুর্গত এলাকায় পাঠিয়েছে।
বন্যায় দেশটির বিদ্যুৎ অবকাঠামোও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি জানিয়েছে, জলবিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রসহ প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে নেপালে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত আট দক্ষিণ কোরীয় নাগরিক নিখোঁজ এবং আরও ১০ জন আটকা পড়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিখোঁজদের উদ্ধারে নেপাল একটি উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়া দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আকস্মিক বন্যার কারণ কী?
বন্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে নেপালের আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সংস্থা (আইসিআইএমওডি)-এর জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, হিমবাহ থেকে তুষার-বরফ ও পাথরের বড় ধস নামার কারণে নদীর গতিপথে বাধা সৃষ্টি হয়েছিল। পরে সেই বাধা ভেঙে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে নেমে এসে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে।
দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যাল জানিয়েছেন, গত ১৪ মাসে লেহেন্দে খোলা নদীতে দ্বিতীয়বারের মতো বড় ধরনের বন্যা হয়েছে। এবার নেপালের দিকের একটি হিমবাহ থেকে বরফ-পাথরের ধস নদী আটকে দেওয়ার পর হঠাৎ স্রোত সৃষ্টি হয়ে নিচের দিকে নেমে আসে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে নিয়মিত বন্যা ও ভূমিধস হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হয়ে উঠছে।
গত বছরও ভোতে কোশি নদীতে বন্যায় নয়জন নিহত ও ২৪ জন নিখোঁজ হয়েছিলেন। সে সময় নেপাল-চীন সংযোগকারী ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ’ ভেসে যাওয়ায় কয়েক মাস ধরে দুই দেশের যোগাযোগ ও বাণিজ্য ব্যাহত হয়েছিল।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর