নেপালে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যা, ভূমিধস ও হিমবাহ-সংশ্লিষ্ট দুর্যোগের মাত্রা ও ঘনত্ব উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। ২৬ আগস্ট নেপালের রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় শতাধিক মানুষ নিহত ও শত শত মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পর আবারও সামনে এসেছে—কেন দেশটি এত বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে?
ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নেপালের দুর্যোগঝুঁকির পেছনে মূলত দুটি বড় প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া কাজ করছে। একদিকে উষ্ণ হয়ে উঠছে হিমালয়, অন্যদিকে ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ এখনো অব্যাহত।
কীভাবে শুরু হলো সাম্প্রতিক বন্যা?
২৬ আগস্ট সকালে নেপালের রাসুয়া জেলার ভোতে কোশি নদীতে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি নেমে আসে। প্রবল স্রোত সীমান্তবর্তী জনপদ ও অবকাঠামো ধ্বংস করে ত্রিশূলী নদীর দিকে এগিয়ে যায়। সন্ধ্যার মধ্যে নেপালে ১৫০ জনের বেশি নিহত এবং প্রায় ৪০০ জন নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া যায়। একই নদীপথের প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকায় ১৩ মাসের মধ্যে এটি দ্বিতীয় ভয়াবহ বন্যা।
প্রাথমিকভাবে ওই দুর্যোগের সঙ্গে ভূমিকম্পের সম্পর্কের কথা বলা হয়েছিল। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটের একটি ভূকম্পনের কথা জানিয়েছিলেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) পরবর্তী বিশ্লেষণে জানায়, কম্পনটি আসলে ভূমিধসের কারণে সৃষ্টি হয়েছিল, ভূমিকম্পের কারণে নয়।
তবে বিজ্ঞানীদের একটি অংশের ধারণা, হিমবাহ থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল ধস নেমে লেহেন্দে খোলা নদীর গতিপথ আটকে দিয়েছিল। পরে পানি জমে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে হঠাৎ বিপুল স্রোত নিচের দিকে নেমে আসে। স্যাটেলাইট বিশ্লেষণেও নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে হিম-চট্টানের ধসের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
গলছে হিমালয়, বাড়ছে ঝুঁকি
হিমালয়ের তাপমাত্রা বাড়ার ফলে হিমবাহ দ্রুত গলছে। এতে পাহাড়ি এলাকায় অস্থিতিশীল বরফ, পাথর ও পানির আধার তৈরি হচ্ছে। কোনো হিমবাহ বা হিমবাহ-সংলগ্ন হ্রদে বড় ধরনের ধস বা বাধ ভেঙে গেলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পানি নিচের দিকে নেমে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করতে পারে।
এনডিটিভির আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমালয়ের হিমবাহগুলো ২০০০ সালের তুলনায় এখন প্রায় দ্বিগুণ দ্রুত গলছে। ফলে এই অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের পানি নিরাপত্তার পাশাপাশি আকস্মিক বন্যা ও হিমবাহ-সংশ্লিষ্ট দুর্যোগের ঝুঁকিও বাড়ছে।
কেন নেপাল ভূমিকম্পপ্রবণ?
নেপালের ভৌগোলিক অবস্থানও দেশটির দুর্যোগঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। ভারতীয় প্লেট উত্তর দিকে এগিয়ে ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষের ফলেই হিমালয় পর্বতমালার সৃষ্টি হয়েছে এবং ভূগর্ভে বিপুল চাপ জমা হচ্ছে।
ফলে নেপাল বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। ভূমিকম্পের পাশাপাশি পাহাড়ের খাড়া ঢাল ও দুর্বল ভূপ্রকৃতি ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়ায়। ভারী বৃষ্টিপাত বা ভূমিকম্পের পর এসব ভূমিধস আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
একই এলাকায় বারবার দুর্যোগ
রাসুয়া ও ভোতে কোশি নদী এলাকায় গত বছরও বড় ধরনের বন্যা হয়েছিল। ওই ঘটনায় নয়জন নিহত এবং ২৪ জন নিখোঁজ হন। নেপাল ও চীনের মধ্যে যোগাযোগকারী ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ’ও ভেসে যায়, ফলে কয়েক মাস ধরে দুই দেশের যোগাযোগ ও বাণিজ্য ব্যাহত হয়।
এবারের বন্যা তাই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা হিমালয়, সক্রিয় টেকটোনিক অঞ্চল, খাড়া পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এবং বর্ষাকালের অতিবৃষ্টির সম্মিলিত প্রভাব নেপালকে ক্রমেই বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব দুর্যোগ পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদের নিয়মিত নজরদারি এবং দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা জোরদার করে প্রাণহানি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর