রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসই হত্যাকারী বলে দাবি করেছে মহানগর পুলিশ। দুই আসামির আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, চারজনের মধ্যে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও মেয়েকে বাড়ির ছাদে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহগুলো এমনভাবে রাখা হয়, যাতে পাশের বাড়ির ছাদ থেকে সহজে দেখা না যায়।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ। তিনি গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বিভিন্ন অংশ সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর সিদ্ধার্থ দাস ইয়াবা নিয়ে মুগ্ধ দাসকে সঙ্গে করে সীমান্তের বাসায় যান। সেখানে তারা কয়েকটি ইয়াবা সেবন করেন। পরে আরও ইয়াবা সংগ্রহ করে রাতের শেষভাগে তারা আবার ওই এলাকায় যান। এরপর রাস্তার কুকুর দেখে তারা প্রাচীর টপকে পাশের একটি বাড়িতে ঢোকেন এবং সেখানকার ছাদ হয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ওঠেন।
পুলিশ কমিশনার জানান, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদটি হাফ-ওয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল। ফলে বাইরে থেকে সহজে ছাদটি দেখা যেত না। সেখানে পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে তারা আবার ইয়াবা সেবন করতে থাকেন। একপর্যায়ে ভোর হয়ে গেলেও তারা বিষয়টি খেয়াল করেননি। জবানবন্দি অনুযায়ী, ওই রাতে তারা মোট আটটি ইয়াবা সেবন করেন।
পুলিশের দাবি, সকালে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে এসে তাদের দেখতে পান। তিনি দুজনকে ধমক দিয়ে সেখানে থাকার কারণ জানতে চান। এ সময় নিজেদের ‘মান-সম্মান’ রক্ষার কথা ভেবে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ তাকে গামছা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরে তার মরদেহ ছাদের এক পাশে টিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।
পুলিশ জানায়, গণপতির স্ত্রী ও মেয়ে শব্দ শুনে ছাদে এলে তারা চিৎকার শুরু করেন। তখন মুগ্ধ গণপতির স্ত্রীর গলা চেপে ধরেন এবং সিদ্ধার্থ তার মেয়েকে শ্বাসরোধ করেন। পরে দুজন মিলে একই গামছা ব্যবহার করে মেয়েটিকেও হত্যার চেষ্টা করেন। এতে মৃত্যু না হলে কবুতরের খাবার রাখার বাক্স থেকে রশি নিয়ে তার গলায় পেঁচিয়ে দুই দিক থেকে টান দেওয়া হয় বলে জবানবন্দির বরাত দিয়ে জানিয়েছে পুলিশ।
এরপর তারা বাড়ির ভেতরে ঢুকে গণপতির ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীকে দেখতে পান। পুলিশ বলছে, প্রিয়ম সিদ্ধার্থকে দেখে তার সঙ্গে কথা বলার সময় তার গলায় কাপড় পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর বাড়িতে সিসি ক্যামেরা থাকার আশঙ্কা করেন দুই আসামি। পরে ছাদে পড়ে থাকা একটি পুরোনো প্লাস দিয়ে বাড়ির বিদ্যুতের তার কেটে দেওয়া হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। গণপতির মরদেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয় এবং তার স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ ছাদের সিঁড়ির গেটের আড়ালে রাখা হয়।
পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডকে চুরি বা ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখাতে ঘরের ড্রয়ার খুলে জিনিসপত্র এলোমেলো করা হয়। মুগ্ধ ঘর থেকে স্বর্ণালঙ্কার এনে দিলে সিদ্ধার্থ সেগুলো প্লাস্টিকের বাক্স ও কাপড়ের প্যাকেটে রাখেন। পরে তারা বাড়ি থেকে ১৫ হাজার টাকা নিয়ে বেরিয়ে যান।
পুলিশ জানায়, জুমার নামাজের সময় তারা গণপতির বাড়ির ছাদ হয়ে পাশের বাড়ির ছাদে যান। এরপর দেয়াল টপকে এলাকা ত্যাগ করেন। মুগ্ধ টাকা এবং সিদ্ধার্থ স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে যান। পরে সিদ্ধার্থ মুগ্ধর কাছ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা নিয়ে বন্ধক রাখা নিজের মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন।
পুলিশ কমিশনার বলেন, গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাসও আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে একই ধরনের বর্ণনা দিয়েছেন। তাদের ডোপ টেস্ট ও ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার প্রক্রিয়া চলছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা হচ্ছে।
এদিকে ময়নাতদন্তের বরাত দিয়ে পুলিশ কমিশনার জানিয়েছেন, চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। নিহত দুই নারীর মরদেহের ভ্যাজাইনাল সোয়াব পরীক্ষায় ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।
পুলিশের ভাষ্য, হত্যার সময় আসামিদের চিৎকার শুনেছিলেন এক প্রতিবেশী নারী। তিনি বিষয়টি পুলিশকে জানান। এ ঘটনায় সীমান্ত দাস ও দখিগঞ্জ শ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাসের জবানবন্দিও আদালতে রেকর্ড করা হয়েছে। এসব জবানবন্দি, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার।
সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকরা মামলার তদন্ত, হত্যার উদ্দেশ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেন। দু-একটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পর অন্য প্রশ্নগুলোর উত্তর না দিয়েই দ্রুত সংবাদ সম্মেলনস্থল ত্যাগ করেন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর