শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের আধুনিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেন, শিক্ষকদের সম্মানজনক অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করারও পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
তিনি জানান, ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির আওতায় পর্যায়ক্রমে প্রাথমিক থেকে শুরু করে সব স্তরের শিক্ষকদের হাতে ডিজিটাল ট্যাবলেট তুলে দেওয়া হবে।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শিক্ষা কাঠামো, কারিকুলাম সংস্কার, শিক্ষক মূল্যায়ন, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পুনর্বাসন এবং শিল্পের সঙ্গে শিক্ষার সমন্বয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, কৃত্রিমভাবে জিপিএ-৫ বাড়িয়ে শিক্ষাব্যবস্থার ভুল চিত্র তুলে ধরার সংস্কৃতি বন্ধ করে মেধা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে শিক্ষা খাতকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাহদী আমিন জানান, ২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশের শিক্ষাক্রমে বড় ধরনের সংস্কার আনা হবে। এর প্রস্তুতি হিসেবে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকেই চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও খেলাধুলাসহ নতুন কিছু বিষয় পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হচ্ছে।
আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে চারটি নতুন বই ও বিষয় যুক্ত করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা ও শারীরিক শিক্ষাভিত্তিক ‘স্পোর্টস অ্যান্ড কালচার’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘টেকনিক্যাল এডুকেশন’ পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে রোবটিকস, এআই ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করানো হবে।
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, অতীতে পরিসংখ্যান ভালো দেখানোর জন্য কৃত্রিমভাবে জিপিএ-৫ বাড়ানো হতো। এমনকি পরীক্ষা ছাড়াই পাস করিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতিও ছিল। বর্তমান সরকার সেই প্রক্রিয়া বন্ধ করেছে। এবার কোনো গ্রেস নম্বর দেওয়া হয়নি এবং শিক্ষার্থীদের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ মূল্যায়নের ভিত্তিতে ফল প্রকাশ করা হয়েছে।
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য বা ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্র বোঝা হিসেবে দেখবে না বলেও জানান তিনি। এসব শিক্ষার্থীকে টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি), স্বল্পমেয়াদি কারিগরি ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণে যুক্ত করে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজনে তাদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হবে।
বেকারত্ব কমাতে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীরা নিজেদের দক্ষতার তথ্য নিবন্ধন করতে পারবেন। একই সঙ্গে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ও নেটওয়ার্ক তৈরির সুযোগ হবে।
মাহদী আমিন বলেন, বেসরকারি খাতকে যুক্ত করে এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ কার্যক্রম প্রথমে বিভাগীয় পর্যায়ে শুরু করা হবে। পরে তা দেশের প্রতিটি জেলায় সম্প্রসারণ করা হবে। এতে পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতি ও সামাজিক সুরক্ষার মূলধারায় যুক্ত করা সম্ভব হবে।
শিক্ষকতা পেশাকে আরও আকর্ষণীয় করা এবং শিক্ষকদের ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে সব স্তরের শিক্ষকদের ডিজিটাল ডিভাইস দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি আধুনিক প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও সম্মানজনক অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে উন্নতির জন্য স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সমস্যা সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। প্রবাসী বাংলাদেশি গবেষক ও শিক্ষকদের দেশে ফিরিয়ে এনে ‘ব্রেন ড্রেন’কে ‘ব্রেন সার্কুলেশনে’ রূপান্তরের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন। পাশাপাশি গবেষণায় সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে।
গ্রাম ও শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বৈষম্য কমাতে দেশব্যাপী ‘প্রাইমারি স্কুল গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট’ এবং ‘ইনোভেশন ও স্টার্টআপ কম্পিটিশন’-এর মতো জাতীয় প্রতিযোগিতা চালুর কথা জানান তিনি। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিভাবান শিক্ষার্থীদের জাতীয় পর্যায়ে তুলে আনার সুযোগ তৈরি হবে।
মাহদী আমিন বলেন, শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়; দক্ষতা, কর্মসংস্থান, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন প্রজন্ম গড়ে তোলার লক্ষ্যেই সরকার শিক্ষা খাতে সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর