• ঢাকা
  • ঢাকা, সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ১১ সেকেন্ড পূর্বে
শাহীন মাহমুদ রাসেল
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ০১:৩৩ দুপুর

বাবার এজাহারে ছয়জন, পুলিশের মামলায় অজ্ঞাত

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

১১ মার্চ ভোরে বাড়ির উঠানে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা সেই মরদেহ দেখে স্বজনদের কান্না তখনো থামেনি। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ হাসপাতালে পাঠিয়ে পুলিশ নিহতের বাবা নুরুল ইসলামকে বলেছিল, থানায় এজাহার দিতে। মেয়ের মরদেহের সঙ্গে হাসপাতালে না গিয়ে তিনি ছুটলেন উখিয়া থানায়। সেখানে গিয়ে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে একটি এজাহার জমা দেন তিনি।

তার দাবি, এরপর পুলিশ তাকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলে। প্রায় দুই ঘণ্টা পর কয়েকটি কাগজে তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়। কিন্তু তখন তিনি বুঝতে পারেননি, কী কাগজে স্বাক্ষর করছেন। পরে জানতে পারেন, তার দেওয়া নামগুলো আর মামলার এজাহারে নেই। মামলা হয়েছে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে।

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, থানায় দেওয়া তাদের মূল এজাহার বদলে ফেলা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, বাদীর দেওয়া এজাহার পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ নেই। তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরে নিহতের এক দেবরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

চলতি বছরের ১১ মার্চ ভোর ৪টা। উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মোছারখোলা গ্রাম। দুই সন্তানের জননী জদিদা আক্তারকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহের সুরতহাল তৈরি করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পাঠানো হয় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে। পুলিশের নির্দেশে তখনই থানায় যান জদিদার বাবা নুরুল ইসলাম।

তার দাবি, তিনি সেখানে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে লিখিত এজাহার দেন। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তদের মধ্যে ছিলেন জদিদার স্বামী শফিকুল ইসলাম, শ্বশুর নুরুল বশর ওরফে ফকির, শাশুড়ি ফাতেমা বেগম, দেবর নূর শাহেদ, মো. রফিক এবং ভাসুর ছৈয়দুল ইসলাম।

নুরুল ইসলামের অভিযোগ, এসব নাম উল্লেখ করে দেওয়া এজাহার গ্রহণের পর পুলিশ তাকে অপেক্ষা করতে বলে। এরপর তার কাছ থেকে কয়েকটি কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। তিনি জানান, তখনও বুঝতে পারেননি কী ঘটছে।

নুরুল ইসলাম বলেন, তার মেয়ের মরদেহ যখন হাসপাতালে, তখন পুলিশ তাকে এজাহার দিতে বলেছিল। তাই মেয়ের মরদেহের সঙ্গে হাসপাতালে না গিয়ে তিনি থানায় এজাহার জমা দেন। তার দাবি, ছয়জনের নাম উল্লেখ করেই তিনি এজাহার দিয়েছিলেন।

কিন্তু পরে জানতে পারেন, সেই এজাহারের ভিত্তিতে মামলা হয়নি। নিহতের বাবা বলেন, ‘পুলিশ আমার দেওয়া এজাহার পাল্টে অজ্ঞাতনামা আসামি দেখিয়ে মামলা করেছে। তখন আমি বিষয়টি বুঝতে পারিনি।’

এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হওয়ার কথা সেই প্রথম এজাহারটি। কিন্তু পরিবারের হাতে এখন সেই এজাহারের কোনো কপি নেই বলে দাবি তাদের। এখানেই শুরু হয় রহস্য।

জদিদা হত্যার ৪২ দিন পর, ২২ এপ্রিল, নুরুল ইসলামের পরিবারের বিরুদ্ধে থানায় একটি অভিযোগ করা হয়। অভিযোগকারী ছিলেন জদিদার বাবা যে ছয়জনের নাম এজাহারে দিয়েছিলেন বলে দাবি করছেন, তাদের একজন ছৈয়দুল ইসলাম।

নুরুল ইসলামের ভাষ্য, ছৈয়দুলকে তার মেয়েকে চুরি করার অপবাদে গণপিটুনি দিয়ে হত্যার অভিযোগ তুলে তার ও পরিবারের আরও চার সদস্যের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করা হয়। পুলিশ তাদের ডেকে পাঠায়। সেখানেই নুরুল ইসলাম জানতে পারেন, জদিদা হত্যা মামলায় কোনো এজাহারনামীয় আসামি নেই।

তার ভাষ্য, তিনি পুলিশকে জানান, ছৈয়দুল তো তার মেয়ের হত্যা মামলার আসামি। তখন পুলিশ তাকে জানায়, ওই হত্যা মামলায় কোনো নামযুক্ত আসামি নেই। এই ঘটনাই নুরুল ইসলামের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয়।

তিনি এরপর হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, উখিয়া থানার তৎকালীন ওসি, সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং জেলা পুলিশ সুপারের কাছে লিখিতভাবে বিষয়টি জানান বলে দাবি করেন। কিন্তু তার অভিযোগ, সেই আবেদন তাকে ফেরত দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন তিনি।

জদিদা হত্যার ঘটনাটিকে শুধু ১১ মার্চের একটি বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখছে না তার পরিবার।

তাদের দাবি, বিয়ের পর থেকেই শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে জদিদার বিরোধ চলছিল। এর মধ্যে যৌতুকের জন্য নির্যাতনের অভিযোগও ছিল। জদিদার ভাই ওবাইদুল্লাহ বলেন, ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর যৌতুকের জন্য তার বোনকে মারধর করে ডান হাত ভেঙে দেওয়া হয়। ঘটনাটি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নজরেও আসে। সালিশ হয়।

পরিবারের দাবি, ওই সালিশে জদিদার শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে শেষবারের মতো সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু তার ছয় মাস না পেরোতেই জদিদা নিহত হন।

ওবাইদুল্লাহর দাবি, আগের নির্যাতনের এসব তথ্য তার বাবার দেওয়া মূল এজাহারেও ছিল। কিন্তু পুলিশ যে এজাহারের ভিত্তিতে মামলা করেছে, সেখানে এসব নেই।

৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য কামাল উদ্দিনও জদিদার পারিবারিক বিরোধ ও সালিশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তার ভাষ্য, জদিদার স্বামী ও তাকে সালিশের মাধ্যমে আলাদা করে দেওয়া হয়েছিল। শ্বশুরের টিউবওয়েল ও ওয়াশরুম ব্যবহারে বাধা দেওয়া নিয়েও বিরোধ ছিল বলে জানান তিনি। পরে টিউবওয়েল ও টয়লেটের ব্যবস্থা করার জন্য স্বামী জদিদার ওপর চাপ প্রয়োগ করতেন। কিন্তু বাবার বাড়ি থেকে এসবের ব্যবস্থা করতে না পারায় তাকে মারধর করা হয় বলে তার কাছে অভিযোগ আসে।

কামাল উদ্দিন বলেন, তিনি তখন বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেছিলেন। ইউপি ফান্ড কিংবা কোনো এনজিওর মাধ্যমে সুযোগ পেলে টিউবওয়েল ও টয়লেটের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথাও বলেছিলেন।

হত্যার পরদিন গ্রেপ্তার দেবর জদিদা হত্যার পরদিনই তার দেবর নূর শাহেদকে ধারালো দাসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আজাদের দাবি, প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে তদন্তে নূর শাহেদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ বলছে, আদালতে নূর শাহেদ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। এখন তার ভিত্তিতেই মামলার তদন্ত এগোচ্ছে।

ঘটনার পর শাহেদের নাম আসে, তাহলে হত্যার পরপরই নিহতের পরিবারের দেওয়া অভিযোগে তার নাম ছিল কি না, আর থাকলে তা মামলার নথিতে কেন নেই? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আজাদ বলেন, তিনি অনেক হত্যাকাণ্ড দেখেছেন। কিন্তু জদিদা হত্যার দৃশ্য ছিল ভয়াবহ।

তার ভাষ্য, ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ দেখে তিনি নিজেই জ্ঞান হারিয়েছিলেন। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে ফিরে তিনি মামলার দায়িত্ব নেন।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই মামলাটি অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে নথিভুক্ত হয়েছিল। পরিবারের এজাহার পরিবর্তনের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ঘটনার দিন নিহতের বাবা কিংবা পরিবারের কেউ শ্বশুরবাড়ির লোকজন জড়িত বলে জানাননি।

তার দাবি, প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলেই নূর শাহেদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, মামলার চার্জশিট দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। আদালতে নেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি এই মামলায় আরেকটি বিষয়ও প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বাদীপক্ষের আইনজীবী ইউসুফ আরমানের দাবি, হত্যা মামলার এজাহারের সঙ্গে পুলিশ সাধারণত সুরতহাল প্রতিবেদন, ময়নাতদন্তের আবেদনসহ প্রয়োজনীয় নথি আদালতে পাঠায়। কিন্তু এই মামলায় শুরুতে শুধু এজাহার পাঠানো হয়েছে। এ কারণে তারা আদালতে আবেদন করেন।

আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২ জুলাই বিচারক সুরতহাল ও ময়নাতদন্তসংক্রান্ত নথি দাখিলের নির্দেশ দেন। কিন্তু সেই নির্দেশ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি বলে দাবি তার।

আইনজীবী এহেছান সেজান বলেন, আইনগতভাবে এসব নথি চার্জশিটের সঙ্গেও দাখিল করা যায়। তবে মামলার স্বচ্ছতা ও ভিকটিমের আইনি সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য সাধারণত এসব নথি শুরুতেই আদালতে দেওয়া হয়। এই মামলায় কেন তা হয়নি, সে প্রশ্নের উত্তর পুলিশের কাছেই রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। ২২ এপ্রিল ছৈয়দুল ইসলামকে ঘিরে যে অভিযোগ হয়েছিল, সেটিও এই মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

উখিয়া থানার এএসআই ইলিয়াছ বলেন, ছৈয়দুল ইসলামকে তার কর্মস্থল ও বসবাসের জায়গায় নুরুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যরা হত্যার চেষ্টা করেছেন, এমন অভিযোগ পাওয়া যায়। অভিযোগের ভিত্তিতে দুই পক্ষকে ডেকে সতর্ক করা হয় এবং সমঝোতা করা হয় বলে জানান তিনি। তবে ওই অভিযোগে জদিদাকে গণপিটুনিতে হত্যার কথা উল্লেখ ছিল কি না, তা তার মনে নেই।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আজাদও বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। যিনি সালিশ করেছেন, তিনি এ বিষয়ে বলতে পারবেন।

অর্থাৎ জদিদা হত্যার মামলা চলার মধ্যেই তার পরিবারের বিরুদ্ধে করা একটি গুরুতর অভিযোগ থানায় এসেছে, দুই পক্ষকে ডেকে সমঝোতাও হয়েছে। কিন্তু সেই অভিযোগের সঙ্গে মূল হত্যা মামলার কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।

নিহতের পরিবারের এজাহার পরিবর্তনের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন উখিয়া থানার তৎকালীন ওসি নাছির উদ্দিন। তিনি বলেন, বাদীর দেওয়া এজাহার পরিবর্তনের সুযোগ পুলিশের নেই। এটি পুলিশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার।

জদিদার গণধোলাইয়ে মারা যাওয়ার অভিযোগ নিয়ে কেন সালিশ হয়েছিল, জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুলিশকে কেউ অভিযোগ দিলে তা গ্রহণ করতে হয়। পরে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা হয়তো বিষয়টি মীমাংসা করে দিয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ সামীম কবির বলেন, এজাহার পরিবর্তনের অভিযোগ তার জানা নেই। আদালতে কোনো নথি দেওয়া না হয়ে থাকলে অভিযোগপত্র দেওয়ার সময় তা জমা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে বলে জানান তিনি।

তবে আদালত কোনো নির্দেশ দিলে তা পুলিশকে মানতে হয়। নির্দেশ অমান্য করলে আদালত পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে বলেও তিনি জানান।

কুশল/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:

BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ [email protected]
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ [email protected]