কক্সবাজার আদালত প্রাঙ্গণে একজন বিচারককে পিস্তল দেখিয়ে ভয় দেখানোর অভিযোগ উঠেছিল। বিষয়টি জানানো হয়েছিল পুলিশকে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধও করা হয়েছিল। এরপর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে জেলা জজ পদমর্যাদার একাধিক বিচারক লিখিতভাবে পুলিশ সুপারের কাছে গানম্যান চেয়েছিলেন।
অভিযোগ উঠেছে, তাদের কাউকেই গানম্যান দেওয়া হয়নি। নিরাপত্তা চেয়ে দেওয়া চিঠিরও কোনো জবাব মেলেনি।
এর কয়েক মাস পর ২৪ মে দিনদুপুরে আদালত প্রাঙ্গণেই প্রকাশ্যে গোলাগুলি হয়। এতে দুজন গুলিবিদ্ধসহ কয়েকজন আহত হন। আদালত চত্বরে এমন ঘটনায় বিচারক, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে। শুধু আদালত নয়, জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
জেলা পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে কক্সবাজারে ৮৮টি খুন, ১২৭টি ধর্ষণ ও ২৯৭টি অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা হয়েছে ১৫০টির বেশি। এর বাইরে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও অপহরণের বহু ঘটনা ঘটলেও সবকটি থানায় মামলা বা সাধারণ ডায়েরি হিসেবে নথিভুক্ত হয় না। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানের বাইরেও অপরাধের একটি বড় অংশ থেকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এই পরিস্থিতিতে জেলা পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমানের ভূমিকা নিয়েই এখন প্রশ্ন তুলছেন আইনজীবী, সাংবাদিক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের একটি অংশ। তাদের অভিযোগ, পুলিশ সুপারের দুর্বল পুলিশিং, হঠকারী সিদ্ধান্ত, অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের বদলি এবং বিভিন্ন ঘটনায় অভিযোগকারীদের সঙ্গে অসহযোগিতার কারণে মাঠপর্যায়ে পুলিশের কার্যকারিতা কমেছে।
তবে পুলিশ সুপার এসব অভিযোগ মানতে নারাজ। তার দাবি, কক্সবাজারে সংঘটিত অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের পেছনে পরকীয়া ও পারিবারিক বিরোধের মতো কারণ রয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
জেলা জজ পদমর্যাদার একজন বিচারকের ভাষ্য, গত ৩০ নভেম্বর আদালত প্রাঙ্গণে এক যুবক একজন বিচারককে পিস্তল দেখিয়ে ভয় দেখান। পরে আরও দুই বিচারক তৎকালীন সদর থানার ওসি ছমিউদ্দীনকে বিষয়টি জানান। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়। বিষয়টি পুলিশ সুপারকেও জানানো হয়েছিল বলে দাবি ওই বিচারকের। ঘটনার পর জানুয়ারির শুরুতে জেলা জজ পদমর্যাদার একাধিক বিচারক পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমানের কাছে লিখিতভাবে গানম্যান চেয়ে আবেদন করেন।
তাঁর দাবি, তাঁদের কাউকেই নিরাপত্তার জন্য গানম্যান দেওয়া হয়নি। এমনকি লিখিত আবেদনের কোনো জবাবও দেওয়া হয়নি। বিচারকদের নিরাপত্তার বিষয়টি তখনই গুরুত্ব দিয়ে দেখা হলে পরবর্তী সময়ে আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটত কি না, সেই প্রশ্নও তুলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
২৪ মে দুপুরে আদালত প্রাঙ্গণে দুই পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্যে গোলাগুলি হয়। এতে দুজন গুলিবিদ্ধসহ কয়েকজন আহত হন। আদালত এলাকায় আইনজীবী, বিচারক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রতিদিন শত শত বিচারপ্রার্থী যাতায়াত করেন। এমন জায়গায় প্রকাশ্যে অস্ত্রের ব্যবহার বিচারাঙ্গনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আবদুল মন্নান বলেন, স্বাধীনতার পর কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতি তিনি আর দেখেননি।
তার ভাষ্য, খুনের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন এলাকায় দিনদুপুরে ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণের ঘটনা ঘটছে। উখিয়া ও টেকনাফের অনেক এলাকায় সন্ধ্যা নামার আগেই অপরাধীদের ভয়ে এক ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। আদালত চত্বরে গোলাগুলি এবং বিচারকদের অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখানোর অভিযোগকে তিনি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করেন।
তার মতে, কক্সবাজার সীমান্তবর্তী ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন জেলা হওয়ায় এখানে দক্ষ, অভিজ্ঞ ও পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তাদের পদায়ন জরুরি।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে গত ২৪ মার্চ রাতে ছুরিকাঘাতে নিহত হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক খোরশেদ আলম। পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার সময় খোরশেদের সঙ্গে থাকা তারিনের ব্যাগ থেকে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধার করা হয়েছিল। এর আগে তারিন খোরশেদকে হুমকি দিয়েছিলেন বলেও পরিবারের দাবি করেন। ঘটনার পর তারিনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। কিন্তু পরদিন, খোরশেদের জানাজা চলাকালে পুলিশ সুপার সংবাদ সম্মেলন করে তারিনকে নির্দোষ ঘোষণা করেন বলে অভিযোগ পরিবারের।
খোরশেদের পরিবারের বলছেন, তখনো হত্যা মামলা হয়নি, তদন্তও শুরু হয়নি। তাহলে কোন তদন্তের ভিত্তিতে একজনকে নির্দোষ ঘোষণা করা হলো?
একই সংবাদ সম্মেলনে খোরশেদের কাকা তারেককে হত্যাকাণ্ডের প্রধান হোতা হিসেবে দাবি করা হয়। পরে তারেকের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশিত হলে ঘটনার সময় তার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এরপর পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক দেখা দেয়।
পরিবারের অভিযোগ, তারিনকে আসামি না করে সাক্ষী করা হয়। প্রকৃত সন্দেহভাজনদের বাদ দিয়ে ১০ জনকে আসামি করে মামলা দেওয়া হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, পুলিশ সুপারের আপত্তির কারণে তারিনকে জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা তাকে ঘিরে কোনো অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার পরও পুলিশকে অনেক ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় থাকতে হয়েছে বলে সূত্রটির দাবি করেছে।
পরে মামলার বাদী নাওশাদ হোসেন পুলিশের তদন্তে অনাস্থা প্রকাশ করে আদালতের মাধ্যমে মামলাটি পিবিআইয়ে স্থানান্তর করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বর্তমানে তারিন আত্মগোপনে রয়েছেন।
গত ২২ এপ্রিল খুরুশকুলে মন্দিরের সেবায়েত নয়ন সাধুকে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। ক্লুলেস এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন সাংবাদিক অন্তর দে বিশাল। তার অনুসন্ধানের ভিত্তিতে পুলিশ আবদুর রহিম নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে। এরপর এ নিয়ে ফলোআপ প্রতিবেদন প্রকাশ করেন অন্তর দে।
তার অভিযোগ, প্রতিবেদনটি মুছে না ফেললে তাকে হত্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হয়। পুলিশ সুপারের আস্থাভাজন এলআইসি সদস্য সোহেল তাকে এই হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ তার। তবে সোহেল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অন্তর দের দাবি, বিষয়টি পুলিশ সুপারকে জানানোর পরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তাকে প্রশ্ন করা হয়, ‘আপনাকে নিউজ করতে কে বলছে?’
সাধারণ ডায়েরি না করার পরামর্শও পুলিশ সুপার দিয়েছিলেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। পরে আবার হুমকি পাওয়ার পর সাংবাদিকদের প্রতিবাদের মুখে সদর থানা জিডি গ্রহণ করে।
অন্তর দে বলেন, ‘জিডি তদন্ত করতে হবে না মানে কী? পুলিশ সুপার কি আমার লাশের অপেক্ষা করছিলেন?’ ঘটনার প্রতিবাদে সাংবাদিকেরা মানববন্ধন করেন। পূজা উদ্যাপন কমিটিও হুমকির প্রতিবাদ জানায়। পরে কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলের হস্তক্ষেপে আন্দোলন বন্ধ হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করেন।
রামু থানা পুলিশের একটি বড় ইয়াবার চালান আত্মসাতের অভিযোগের তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরে বক্তব্য জানতে চাইলে একটি জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিক শাহেদ ফেরদৌস হিরুকে পুলিশ সুপার প্রশ্ন করেন, ‘ইয়াবা নিয়ে সাংবাদিকদের এত আগ্রহ কেন?’
সাংবাদিক হিরুর অভিযোগ, পুলিশের বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরার পরও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তার অভিযোগ, পুলিশ সুপারের ব্যর্থতা, অদক্ষতা ও পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা সভাতেও অস্বস্তি আইনশৃঙ্খলা কমিটির কয়েকজন সদস্যের অভিযোগ, সভায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে কেউ বক্তব্য দিতে চাইলে পুলিশ সুপার অনেক সময় তাকে থামিয়ে নিজেই কথা বলতে শুরু করেন। এতে মুক্তভাবে মতামত দেওয়ার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ।
সংশ্লিষ্ট সদস্যদের ভাষ্য, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতিতেও পুলিশ সুপার মুঠোফোনে কথা বলেছেন এবং কখনো উচ্চস্বরে কথা বলেছেন। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা-সংশ্লিষ্ট একটি বৈঠকে পুলিশ সুপারের আচরণে প্রকাশ্য ক্ষোভ প্রকাশ করেন কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইনশৃঙ্খলা কমিটির এক সদস্য বলেন, ‘যার নিজের মধ্যেই ন্যূনতম শৃঙ্খলা নেই, তিনি কীভাবে একটি জেলার পুলিশ বাহিনীকে শৃঙ্খলার সঙ্গে পরিচালনা করবেন?’
সম্প্রতি গোপন তথ্য প্রকাশের অভিযোগে জেলা পুলিশের ১০১ সদস্যকে বদলি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭ জন ইন্সপেক্টর, ৩৬ জন এসআই, ২৪ জন এএসআই ও ৩৪ জন কনস্টেবল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বদলি হওয়া সদস্যদের প্রায় ৯৫ শতাংশই চট্টগ্রাম অঞ্চলের। জেলা পুলিশের অন্তত ৩৫ জন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের একটি অংশ মনে করেন, অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিয়ে তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে স্থানীয় রাস্তাঘাট, অপরাধপ্রবণ এলাকা এবং অপরাধীদের সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল। তাদের সরিয়ে দেওয়ায় অভিযান পরিচালনা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা কমেছে বলে কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন।
পুলিশ সুপারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করায় কয়েকজন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এর পাশাপাশি কথায় কথায় এসিআর ও সার্ভিস বুকে বিরূপ মন্তব্যের ভয় দেখানোর কারণে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি গণমাধ্যমে বলেন, ‘সারা দেশে প্রতি মাসে ৩০০টির মতো মার্ডার হয়। কক্সবাজারে ১৫ থেকে ২০টা হয়। সেটা আগে হয়েছিল, এখনো হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘বেশির ভাগ মার্ডারই পরকীয়া ও পারিবারিক কারণে হচ্ছে। খুনের ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে।’
অন্য অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে কিছুটা বিরক্তির সুরে পুলিশ সুপার বলেন, ‘আমি তো অথর্ব এসপি। আপনাদের প্রিয় এসপি যখন ছিল, তখনো মার্ডার এমন হতো।’ এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর