রংপুরের বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর চার খুনের ঘটনাটি তাৎক্ষণিক কোনো বিরোধ কিংবা মাদক সেবনের জেরে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এটি ছিল পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—এমনই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে একাত্তর টেলিভিশনের বিশেষ অনুসন্ধানে।
নিহতরা হলেন রংপুর জেলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ দুই তরুণ সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে গ্রেপ্তার করে এবং তাদের জবানবন্দির ভিত্তিতে দাবি করা হয়, মাদক সেবনের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই চারজনকে হত্যা করা হয়েছে। তবে পরবর্তী অনুসন্ধানে পুলিশের সেই প্রাথমিক বক্তব্যের সঙ্গে বিভিন্ন তথ্যের অসংগতি সামনে এসেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঘটনার রাতে কথিত মাদক সেবনের স্থান, অভিযুক্তদের চলাচল এবং সীমান্ত নামের এক তরুণের মায়ের বক্তব্যের সঙ্গে পুলিশের এজাহারে উল্লেখ করা তথ্যের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে ওঠার পথেই মাদক সেবনের সুযোগ থাকার পরও কেন অভিযুক্তরা সেখানে না থেকে নিঃশব্দে একে একে চারজনকে হত্যা করবে—এমন প্রশ্নও উঠেছে।
আরও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে হত্যাকাণ্ডের সময় প্রতিবেশীরা কোনো ধরনের চিৎকার বা শব্দ শুনতে না পাওয়ায়। এতগুলো মানুষকে হত্যা করা হলেও আশপাশের কেউ বিষয়টি টের না পাওয়ার ঘটনাটিও তদন্তে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি। ২১ আগস্ট রাত ৩টা থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত গণপতি চক্রবর্তী ও অভিযুক্তদের মোবাইল ফোন একই টাওয়ার এলাকার মধ্যে থাকলেও তারা একই স্থানে অবস্থান করছিলেন না। ফলে শুধু মোবাইল টাওয়ারের অবস্থান দিয়ে তাদের ঘটনাস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায় কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পেছনে আর্থিক কারণ থাকার কথাও আলোচনায় আসে। গুঞ্জন ছিল, গণপতি চক্রবর্তীর প্রভিডেন্ট ফান্ডে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ছিল। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাচারী বাজার সোনালী ব্যাংক শাখায় থাকা ওই প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে তিনি কোনো টাকা উত্তোলন করেননি। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র অনুযায়ী, এলপিআরে থাকায় তাঁর পেনশনের অর্থ পাওয়ার সুযোগও ছিল না। ফলে আর্থিক লাভের জন্য এই হত্যাকাণ্ড—এমন ধারণারও এখন পর্যন্ত শক্ত ভিত্তি পাওয়া যায়নি।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের সময়কার সিসিটিভি ফুটেজেও কোনো অস্বাভাবিক মোটরসাইকেল বা সন্দেহজনক চলাচলের দৃশ্য পাওয়া যায়নি বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তবে আরও রহস্য তৈরি হয়েছে গণপতি চক্রবর্তীর ঘরের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনায়।
জানা গেছে, ঘরের বিদ্যুৎ সংযোগটি পোল থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। অথচ বিষয়টি নিয়ে নেসকো কিংবা পুলিশের পক্ষ থেকে তেমন কোনো তদন্ত করা হয়নি। নির্দিষ্ট ফিডারে সেদিন মাত্র ১ ঘণ্টা ১৩ মিনিট লোডশেডিং থাকার তথ্যের সঙ্গে পোল থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টি মেলাতে গিয়ে নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের বক্তব্যেও হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। তাদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের আগে থেকেই গণপতি চক্রবর্তী চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। তাঁর চায়ের দোকানি বন্ধু প্রদীপ ও শ্যালিকা জানান, প্রায় দেড় মাস ধরে তিনি অস্বাভাবিকভাবে ঘর বন্ধ করে ঘুমাতেন। এমনকি কৌতুকের ছলেও নিজের জীবননাশের আশঙ্কার কথা বলতেন তিনি।
নিহতদের মধ্যে কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থী আগামী চক্রবর্তীও ছিলেন। মৃত্যুর আগে এক বন্ধুর সঙ্গে চ্যাটে তিনি একজন সরকারি চাকরিপ্রার্থীর বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার বিষয়ে পরামর্শ চেয়েছিলেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। এই তথ্যও হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
গণপতি চক্রবর্তীর ব্যবহৃত শেষ ফোনের কল রেকর্ড বিশ্লেষণেও পাওয়া গেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। তাঁর ইনকামিং ও আউটগোয়িং কলের মধ্যে সর্বশেষ কলটি এসেছিল ২০ আগস্ট বিকেলে তাঁর স্ত্রীর মোবাইল নম্বর থেকে। পরে ফোনটি ২১ আগস্ট ভোর ৬টা ৫ মিনিটে বন্ধ হয়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, এই সময়সীমার মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়ে থাকতে পারে।
এদিকে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তীও স্বীকার করেছেন, অভিযুক্তরা জবানবন্দিতে মাদক সেবনের কথা বলে তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করে থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে, প্রাথমিক তদন্তে মাদক সেবনকে কেন্দ্র করে চার হত্যার যে বয়ান সামনে এসেছিল, অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য-প্রমাণে তার সঙ্গে একাধিক অসংগতি দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, নিহতদের আগের নিরাপত্তাহীনতা, ফোনের তথ্য, আর্থিক কারণের দুর্বলতা এবং সম্ভাব্য অন্য বিরোধের বিষয়গুলোও সামনে এসেছে।
এ অবস্থায় নিহত পরিবারের স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। তারা প্রকৃত হত্যার উদ্দেশ্য, পরিকল্পনাকারী এবং এর নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ পুনঃতদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এখন প্রশ্ন একটাই—রংপুরের এই চার খুনের নেপথ্যে আসলে কে বা কারা? মাদক সেবনের গল্পের আড়ালে কি লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনো রহস্য? সেই উত্তর খুঁজতেই প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্ত।
রোহান/সা.এ.
সর্বশেষ খবর