যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ‘ধ্বংস’ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছিল ওয়াশিংটন। তবে সেই দাবির মধ্যেই ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় আবারও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি শুরু করেছে তেহরান—এমন তথ্য সামনে এসেছে। যদিও মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মজুত এবং নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা ধ্বংস করা।
প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালজানিয়েছে, আগে থেকে মজুত থাকা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের শুরুতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা ও শিল্পকারখানায় ব্যাপক হামলা চালানো হলেও দেশটি আবার দুই ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। এর মধ্যে তরল জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে, যেগুলো উৎক্ষেপণের ঠিক আগে জ্বালানি ভরতে হয়। অন্যদিকে কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র আগে থেকেই প্রস্তুত অবস্থায় সংরক্ষণ করা যায়।
তবে ইরান এখন মূলত আগে থেকে মজুত থাকা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে এবং আগের তুলনায় সীমিত পরিমাণে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ফের শুরু হওয়ার এই খবর ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র বড় সাফল্য হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসনের করা দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
কারণ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন, ওই সামরিক অভিযানে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং প্রচলিত অস্ত্র তৈরির বেশিরভাগ অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়েছে। কিন্তু একাধিক কর্মকর্তা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন, তেহরান আবার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। এর মধ্যে উৎক্ষেপণের ঠিক আগে জ্বালানি ভরতে হয় এমন তরল জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র এবং আগে থেকেই প্রস্তুত অবস্থায় রাখা যায় এমন কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে।
হোয়াইট হাউস এই প্রতিবেদন অস্বীকার করেনি। তবে তারা জানিয়েছে, পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা নিউইয়র্ক পোস্টকে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেমন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নজর রাখছে এবং তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর আমাদের নজর রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলো ধ্বংস করেছে, তাদের প্রতিরক্ষা শিল্পের বড় অংশ গুঁড়িয়ে দিয়েছে, নৌবাহিনীকে ডুবিয়ে দিয়েছে এবং বিমানবাহিনীকে কার্যত অকার্যকর করে দিয়েছে। ইরান এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দুর্বল এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কখনোই ইরানকে পরমাণু অস্ত্র অর্জন করতে দেবেন না।’
মূলত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মজুত এবং নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা ধ্বংস করা। মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন, তাদের বোমা হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের ৮৫ শতাংশ ধ্বংস হয়েছে। এতে দেশটির বেশিরভাগ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী যান এবং দূরপাল্লার হামলা চালাতে সক্ষম ড্রোন ধ্বংস হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
এপ্রিল মাসে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও বলেছিলেন, তেহরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ‘কার্যত ধ্বংস’ হয়ে গেছে। তবে এখন দেখা যাচ্ছে, ইরানের কিছু ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনা হামলা থেকে বেঁচে গেছে। আর নতুন সরবরাহব্যবস্থা তৈরি না করে তেহরান আগে থেকে মজুত থাকা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করেই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত চলতে পারে। একই সময় পর্যন্ত জ্বালানির দামও বেশি থাকবে বলে তিনি মনে করছেন।
ট্রাম্প এর জন্য ইরানকে দায়ী করেছেন। তার দাবি, নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতেই ইরান এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে।
গত বুধবার জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘তারা নির্বাচনে প্রভাব ফেলার জন্য মরিয়া চেষ্টা করছে, যাতে সেখানে দুর্বল একদল মানুষকে আমরা পাই। এরপর তাদের ছেড়ে দিই এবং তাদের পরমাণু অস্ত্র বানাতে দিই।’
অবশ্য বেশিরভাগ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন না। গত মাসে রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে দেখা যায়, মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিনি এই যুদ্ধকে সমর্থন করেন। অন্যদিকে জ্বালানির দামও বেশি রয়েছে। চলতি সপ্তাহে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।
তবে এসব সমালোচনা উপেক্ষা করে নিজের অবস্থানেই অনড় রয়েছেন ট্রাম্প। ফক্স নিউজের লরা ইনগ্রাহামের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তার কোনো অনুশোচনা নেই। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি ‘অনুশোচনা’ শব্দটিতে বিশ্বাস করি ।
তিনি আরও বলেন, ‘নিজেকে সব সময়ই একটু প্রশ্ন করা যায়। কয়েকজন আমাকে এ কথাও জিজ্ঞেস করেছেন। আবারও যদি একই পরিস্থিতিতে পড়ি, তাহলে আমি ঠিক একই কাজ করব।’
রোহান/সা.এ.
সর্বশেষ খবর