কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আইনি সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে সম্প্রতি গঠিত ‘বাংলাদেশ আইন সহায়ক কমিটি’ নিয়ে দলটির ভেতরে আলোচনা ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যেসব আইনজীবী দলটির নেতাকর্মীদের আইনি সহায়তা দিয়ে আসছেন, তাঁদের কয়েকজন কমিটিতে জায়গা পাননি। অন্যদিকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত কয়েকজনের অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
দলীয় সূত্রের দাবি, ৫ আগস্টের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আইনি সহায়তা দিয়ে আলোচনায় আসেন আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন (রাখি)। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি এ পর্যন্ত তিন শতাধিক নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মামলায় আইনি সহায়তা দিয়েছেন।
সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের পক্ষে একাধিক রিমান্ড ও ট্রাইব্যুনাল শুনানিতেও অংশ নিয়েছেন ফারজানা ইয়াসমিন। এ ছাড়া গুলশানে ‘গোপন বৈঠকের’ অভিযোগে গ্রেপ্তার যশোর ও মাদারীপুরের কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পক্ষে আইনি কার্যক্রমে তিনি যুক্ত ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
গত ৪ আগস্ট ঢাকা জজকোর্ট এলাকায় নিজের চেম্বারে হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগও করেছিলেন এই আইনজীবী। এমন পরিস্থিতিতে কাজ করার পরও নতুন আইন সহায়ক কমিটিতে তাঁর নাম না থাকায় দলটির সংশ্লিষ্টদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন।
এ বিষয়ে ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, তিনি কোনো পদ বা ব্যক্তিগত প্রাপ্তির প্রত্যাশায় নেতাকর্মীদের আইনি সহায়তা করেননি। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজের বিবেচনা থেকেই তিনি কাজ করেছেন। কমিটিতে থাকা বা না থাকা নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত আক্ষেপ না থাকলেও দুঃসময়ে কাজ করা আইনজীবীদের মূল্যায়ন করা হলে তাঁদের কাজের আগ্রহ বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।
অন্যদিকে নতুন কমিটিতে কেন্দ্রীয় সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে ঢাকা জজকোর্টের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান হিরনকে। তাঁকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়েই সংশ্লিষ্টদের একাংশের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁর অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগও সামনে এসেছে।
দলীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, ছাত্রজীবনে হিরনের সঙ্গে ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সম্পৃক্ততা ছিল। প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে ভৈরব কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর তিনি বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মুগদা শাখায় ভর্তি হন। ওই সময় ছাত্রশিবিরের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।
পরবর্তী সময়ে আইন পেশায় যুক্ত হওয়ার পর তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। ২০২৩ সালের দিকে যশোরের তৎকালীন একজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন দলটির সংশ্লিষ্টদের একাংশ। তাঁদের দাবি, ওই সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও পরবর্তী সময়ে সরকারের দায়িত্ব পাওয়া কয়েকজনকে প্রশংসা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছিলেন হিরন।
আরও গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মামলায় জড়িয়ে পড়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জামিন করিয়ে দেওয়ার নামে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে। দলটির সংশ্লিষ্ট কয়েকজন এটিকে ‘জামিন বাণিজ্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে এসব আর্থিক অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য নথি পাওয়া যায়নি।
হিরনের পরিবারের কয়েকজন সদস্যের জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁর বাবা ও কয়েকজন চাচার জামায়াত-শিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া তথ্যে দাবি করা হয়েছে। তবে পারিবারিক সদস্যদের রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে হিরনের নিজের রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করা যায় না; তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর পৃথক যাচাই প্রয়োজন।
আইন সহায়ক কমিটির গঠন ও এ নিয়ে তৈরি হওয়া অসন্তোষের বিষয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এক জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কমিটি গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যেসব আইনজীবী নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের অবদান অবমূল্যায়নের সুযোগ নেই এবং পর্যায়ক্রমে তাঁদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
হিরনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে ওই নেতা বলেন, কারও অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে সাংগঠনিকভাবে বিবেচনা করা হবে।
তবে মাহবুবুর রহমান হিরনের বিরুদ্ধে ওঠা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, অর্থ গ্রহণসহ অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
সর্বশেষ খবর