শীত নামলেই তার হৃদস্পন্দন থেমে যায়, শরীর জমে যায় বরফে—তবু বসন্তে আবার লাফিয়ে ওঠে!
প্রকৃতিতে এমন কিছু প্রাণী আছে, যাদের বেঁচে থাকার কৌশল শুনলে রূপকথার গল্প মনে হতে পারে। উড ফ্রগ (Wood Frog)তাদেরই একজন। উত্তর আমেরিকার এই ছোট ব্যাঙ শীতের সময় শরীরের বড় অংশ বরফে পরিণত হওয়ার পরও বেঁচে থাকতে পারে। বসন্তে বরফ গললে আবার তার হৃদস্পন্দন শুরু হয়, শ্বাস-প্রশ্বাস ফিরে আসে এবং সে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে থাকে।
উড ফ্রগের বৈজ্ঞানিক নাম Lithobates sylvaticus—আগে Rana sylvatica নামটিও ব্যবহৃত হতো। উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এদের দেখা যায়; এমনকি আলাস্কার আর্কটিক অঞ্চলেও এরা টিকে আছে। শীতের তীব্র ঠান্ডায় ব্যাঙটির শরীরের পানি জমতে শুরু করে। এর চোখ, পা ও শরীরের অন্যান্য অংশ শক্ত হয়ে যেতে পারে। হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়, শ্বাস-প্রশ্বাসও থেমে যায়। বাইরে থেকে দেখলে প্রাণহীন বরফের টুকরোর মতো মনে হয়।
শরীরকে ‘অ্যান্টিফ্রিজ’ বানায় চিনি! বরফ জমতে শুরু করলে উড ফ্রগের লিভার প্রচুর পরিমাণে গ্লুকোজ তৈরি করে। এই গ্লুকোজ রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়ে। এর কাজ অনেকটা গাড়ির অ্যান্টিফ্রিজের মতো—তবে একেবারে একই রাসায়নিক প্রক্রিয়া নয়। গ্লুকোজ কোষের ভেতরের পানি ধরে রাখতে এবং অতিরিক্ত পানিশূন্যতা থেকে কোষকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, উড ফ্রগের ক্ষেত্রে বরফ মূলত কোষের বাইরে তৈরি হয়। কোষের ভেতরে বরফের ক্ষতিকর স্ফটিক তৈরি হওয়া ঠেকানোই বেঁচে থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।
বরফাবস্থায় ব্যাঙটির বিপাকীয় কার্যক্রম ব্যাপকভাবে কমে যায়। হৃদস্পন্দন বন্ধ থাকে, শ্বাস-প্রশ্বাসও বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় প্রাণীটির শরীর কার্যত একটি অত্যন্ত নিম্ন-বিপাকীয় অবস্থায় চলে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, বরফে জমে থাকা অবস্থায় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিপাকীয় কার্যক্রম ব্যাপকভাবে দমন হয়।
তাই বাইরে থেকে মৃত মনে হলেও ভেতরে তার কোষগুলো এক বিশেষ জৈবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে টিকে থাকে।
এখানেই উড ফ্রগের সবচেয়ে অবাক করা ক্ষমতা। আলাস্কার একটি উত্তরাঞ্চলীয় জনগোষ্ঠী নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু উড ফ্রগ প্রায় –১৬°C পর্যন্ত তাপমাত্রায় জমে থেকেও বেঁচে থাকতে পারে। অন্য একটি আলাস্কান মাঠ-গবেষণায় ব্যাঙগুলোকে –১৮°C পর্যন্ত তাপমাত্রা এবং প্রায় সাত মাস জমে থাকা অবস্থার পরও জীবিত পাওয়া গেছে। তবে এটি সব উড ফ্রগের ক্ষেত্রে একই নয়। কোন অঞ্চলের ব্যাঙ, কত দ্রুত ঠান্ডা হচ্ছে, কতক্ষণ জমে থাকছে—এসব বিষয় বেঁচে থাকার ওপর বড় প্রভাব ফেলে। গবেষণায় ধীরগতিতে ঠান্ডা হওয়া এবং পর্যাপ্ত ক্রায়োপ্রটেক্ট্যান্ট তৈরি হওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ বলে দেখা হয়েছে।

তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করলে বরফ ধীরে ধীরে গলতে থাকে। এরপর আশ্চর্যজনকভাবে ব্যাঙটির হৃদস্পন্দন ফিরে আসে। পরে শ্বাস-প্রশ্বাস ও অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমও স্বাভাবিক হতে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, হৃদযন্ত্রের কার্যক্রম ফিরে আসা পুনরুদ্ধারের প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি। এরপর শ্বাস-প্রশ্বাস ও চলাফেরার প্রতিক্রিয়া ফিরে আসে।
আলাস্কায় গবেষকরা এমন উড ফ্রগও দেখেছেন, যারা শীতের দীর্ঘ সময় বরফে জমে থাকার পর বসন্তে আবার স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা শুরু করেছে।
উড ফ্রগ শুধু প্রকৃতির বিস্ময় নয়—ক্রায়োবায়োলজি বা জীবন্ত কোষ ও টিস্যুকে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণের গবেষণার জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। কীভাবে একটি প্রাণী শরীরের এত বড় অংশ বরফে জমে যাওয়ার পরও কোষকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা। ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় উড ফ্রগের freezing ও thawing-এর সময় জিনের কার্যকলাপও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে বিপাক নিয়ন্ত্রণ, কোষের অখণ্ডতা এবং বরফ গলার পর পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহু জৈবিক পরিবর্তন শনাক্ত হয়েছে।

উড ফ্রগ সত্যিই শীতকালে আংশিকভাবে বরফে পরিণত হতে পারে। তার হৃদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাস থেমে যেতে পারে। কিন্তু উপযুক্ত পরিবেশে শরীর গলে গেলে সে আবার জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসে।
অর্থাৎ, প্রকৃতির ভাষায়—“জমে যাওয়া মানেই সবসময় মৃত্যু নয়।”
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
ভিন্ন স্বাদের খবর এর সর্বশেষ খবর